বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ক্লিনিক বাণিজ্য

নিকুঞ্জ বালা পলাশ, বরিশাল

বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার ক্লিনিক বাণিজ্য

বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) ডা. মুস্তফা লুৎফুল আজিজের বিরুদ্ধে ক্লিনিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ‘হামিদ মেমোরিয়াল’ নামক একটি বেসরকারি ক্লিনিকের সঙ্গে তার সরাসরি ৩০ পার্সেন্ট ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব রয়েছে এবং সরকারি হাসপাতালের রোগীদের সেখানে পাঠিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে—বিভিন্ন সূত্রে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বশীল পদে থাকার সুযোগে ডা. মুস্তফা হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না দিয়ে রোগীদের নিজস্ব সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে রেফার করেন। বিশেষ করে অপারেশন-সংক্রান্ত রোগীদের সরকারি হাসপাতালে না রেখে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালের অপারেশন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বোঝানো হয়, সেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যান।

বিজ্ঞাপন

তদন্তে জানা গেছে, বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০০৮ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন ডা. মুস্তফা এবং টানা এক যুগ সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। এ সুযোগে তিনি হাসপাতাল-সংলগ্ন হামিদ মেমোরিয়াল ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।

হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ২০২০ সালের দিকে তৎকালীন ইউএইচও ডা. এসএম কবির হোসেন হাসপাতালেই রোগীর অপারেশন করাতেন। কিন্তু ডা. মুস্তফা নিজের ক্লিনিকেই রোগীদের অপারেশন করাতেন। হাসপাতালে অপারেশন করাতে অসহযোগিতা করায় হাসপাতালপ্রধান ডা. মুস্তফাকে অন্যত্র বদলির সুপারিশ করেন। এর ভিত্তিতে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে বদলি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. এসএম কবির হোসেন তিন বছর বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময়ে তিনি দুই হাজার ২০০ রোগীর অপারেশন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ২০২৩ সালে তাকে প্রমোশন দিয়ে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বানারীপাড়ায় ইউএইচও হিসেবে যোগ দেন ডা. মুস্তফা। যোগ দিয়েই তিনি পুনরায় নিজ মালিকানাধীন ক্লিনিকে অপারেশন শুরু করেন। তার ব্যক্তিগত কর্মচারীদের দেওয়া তথ্যমতে, ক্লিনিকের ব্যবসায়িক তদারকি ও নিয়মিত লভ্যাংশ সংগ্রহের বিষয়ে তিনি সরাসরি যুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পদের প্রভাব খাটিয়ে ওই ক্লিনিকটির ব্যবসায়িক প্রসারে তিনি নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করছেন। এমনকি সরকারি হাসপাতালের সম্পদ ও জনবলকেও পরোক্ষভাবে নিজ ব্যবসায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ডা. মুস্তফার বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ক্লিনিকের মূল মালিক ছিলেন বানারীপাড়া উপজেলা সদরের কলেজ রোড এলাকার জনৈক অর্পন হাওলাদার ও তার স্বজনরা। মালিকানা নিয়ে মনোমালিন্যের জেরে তারা বেশ কয়েকটি শেয়ার বিক্রি করে দেন। এ সুযোগে ডা. মুস্তফা ও একই হাসপাতালের তৎকালীন চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান শাকিল সিংহভাগ মালিকানা কিনে নেন। এর মধ্য দিয়েই ওই ক্লিনিকের ৩০ ভাগ মালিক হন ডা. মুস্তফা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইউএইচওর ব্যক্তিগত ক্লিনিক ব্যবসার খেসারত দিতে হচ্ছে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত গরিব-অসহায় রোগীকে। নিজস্ব ক্লিনিকের মুনাফা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের বিভিন্ন অজুহাতে নিজস্ব ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন এবং তাদের কাছ থেকে আদায় করছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির চিকিৎসাসেবা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।

ক্লিনিকের মালিকানার বিষয়টি তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন এবং সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেও ক্লিনিক ব্যবসা করা যায় বলে দাবি করেছেন। সরকারি হাসপাতালের শৃঙ্খলা রক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে খোদ চিকিৎসকের ক্লিনিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিতে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সরকারি চাকরি বিধিমালার চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।

তবে আমার দেশ-এর প্রতিবেদকের কাছে ডা. মুস্তফার ভিন্ন অবস্থান দেখা যায়। হামিদ মেমোরিয়াল নামক বেসরকারি ক্লিনিকের মালিকানার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি আমার দেশকে বলেন, কোনো ক্লিনিকের মালিকানা তার নেই। এমনকি ওই ক্লিনিকে তার কোনো স্বজনের মালিকানাও নেই। তবে একটি নির্ভরযোগ্য অডিও ক্লিপে তাকে দাবি করতে শোনা গেছে, তিনি সরকারি হাসপাতালে প্রশাসনিক দায়িত্বে আসার আগে থেকেই হামিদ মেমোরিয়ালের সঙ্গে শেয়ারে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা অনুমতি ছাড়াই ক্লিনিক ব্যবসা করতে পারেন। অথচ সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসায় লিপ্ত হওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা. এসএম মঞ্জুর এ এলাহী আমার দেশকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে চাকরি করলে তিনি কোনো ক্লিনিকের ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারবেন না। এমন প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...