ব্যবসায়ীদের আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির হুমকি

২৬০ টাকার পেরিফেরি খাজনা এক লাফে বেড়ে ৬ হাজার

উপজেলা প্রতিনিধি, উজিরপুর (বরিশাল)

২৬০ টাকার পেরিফেরি খাজনা এক লাফে বেড়ে ৬ হাজার
ছবি: আমার দেশ

হাটবাজারে পেরিফেরি খাজনা এক লাফে ২৩ গুণ বৃদ্ধি করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। সরকারের নতুন গেজেট অনুযায়ী পূর্বের ২৬০ টাকার খাজনা বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। পরিস্থিতিকে “অস্তিত্ব রক্ষার সংকট” আখ্যা দিয়ে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনসহ বিভিন্ন কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ভূমি মন্ত্রীর বরাবর একাধিকবার লিখিত আবেদন ও স্মারকলিপি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমন অস্বাভাবিক খাজনা বৃদ্ধি কার্যকর হলে দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পথে বসবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান এবং বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে।

২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি করা “হাট ও বাজার স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০২৫” অনুযায়ী নতুন খাজনা কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।

এতে পূর্বে যেখানে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ জমির জন্য খাজনা ছিল মাত্র ২৬০ টাকা, সেখানে এখন তা বৃদ্ধি করে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ খাজনা বেড়েছে প্রায় ২৩ গুণেরও বেশি, যা ব্যবসায়ীদের মতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত।

উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর বন্দরের ব্যবসায়ী হাদিউজ্জামান খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের এ সিদ্ধান্তে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ধ্বংস হয়ে যাবে। অবিলম্বে এই আকাশচুম্বী খাজনা প্রত্যাহার না করলে সারা দেশের ব্যবসায়ীরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।’

হাটবাজারের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন খরচ ও জ্বালানি তেলের চাপে দিশেহারা। এর মধ্যে আবার ২৩ গুণ খাজনা বৃদ্ধি আমাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

পেরিফেরিভুক্ত দোকান মালিক মোহাম্মদ খাইরুল আলম বলেন,

‘আমাদের পূর্বপুরুষের জমি অধিগ্রহণ করে সরকার লিজ দিয়েছে। এখন আবার অস্বাভাবিক খাজনা চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অমানবিক। আমরা এ সিদ্ধান্ত মানি না।’

সরকারি নীতিমালার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতীতে হাটবাজারের খাজনা ধাপে ধাপে এবং সহনীয় পর্যায়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত খাজনা বৃদ্ধির হার সাধারণত ৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার একবারেই ২৩ গুণ বৃদ্ধি করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির নামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অমানবিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। এতে অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন। ফলে গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মণ্ডল বলেন,

‘সরকারি গেজেট অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কিছু করার নেই।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা বলেন, ‘এটি কেন্দ্রীয় নীতিমালার বিষয়। স্থানীয়ভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই।’

এদিকে ব্যবসায়ী নেতারা দ্রুত খাজনা পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বলেন, দাবি মানা না হলে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং পরবর্তীকালে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের হাটবাজার শুধু কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাই হঠাৎ করে এমন অস্বাভাবিক খাজনা বৃদ্ধি দেশের বৃহৎ প্রান্তিক ব্যবসায়ী শ্রেণিকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন