বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য এক অধ্যায় চট্টগ্রাম। এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। এ শহরের মাটি শুধু রক্তে রঞ্জিত হয়নি, এখান থেকেই স্বাধীনতার প্রথম সাহসী আহ্বানগুলোর একটি উচ্চারিত হয়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক আদেশ অমান্য করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তিনি। পরে বেতার মারফত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রণাঙ্গনে তার অসামান্য বীরত্ব ও অবদান ইতিহাস হয়ে আছে। তার এই বীরত্বগাথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
চট্টগ্রামে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ সেই গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তার নিহত হওয়ার স্মৃতি, রাঙ্গুনিয়ায় প্রথম সমাধিস্থল, মুক্তিযোদ্ধা থেকে সফল রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার দীর্ঘ সংগ্রামী পথÑসবকিছুরই নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এ জাদুঘরে। প্রতিটি উপকরণ ও স্মারক যেন তার বর্ণাঢ্য জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে।
চট্টগ্রাম থেকে তার সংগ্রামী জীবনের শুরু এবং বর্ণাঢ্য জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি। এ শহরের সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু ভৌগোলিক নয়; বরং গভীরভাবে ইতিহাস ও আত্মত্যাগে গাঁথা। জিয়া স্মৃতি জাদুঘর সেই ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল সংরক্ষণ করে আসছে। যদিও বিগত কয়েক বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের অবহেলায় জাদুঘরটি কিছুটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে, তবে এটি আজও ইতিহাসের প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে ১৯৯৩ সালে সরকার শহীদ জিয়ার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় এবং সার্কিট হাউসকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করে। ব্রিটিশ আমল ১৯১৩ সালে নির্মিত ভবনটি একসময় ‘লাট সাহেবের কুঠি’ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে জাদুঘরে ১২টি গ্যালারি, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী, আলোকচিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।
বিপ্লব উদ্যানে জিয়ার ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত, অপারেশন সার্চলাইটের নির্মমতার সময় চট্টগ্রামে ভিন্ন দৃশ্য তৈরি করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানি সামরিক আদেশ অমান্য করে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সে সময় মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপঅধিনায়ক ছিলেন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আক্রমণ শুরু হওয়ার খবর পাওয়ার পর তিনি ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণা করেন। তার রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে বিদ্রোহ গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিকরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং পাকিস্তানি অফিসার কর্নেল রশিদ জানজুয়াসহ অন্য অফিসারদের বন্দি করেন।
২৬ মার্চ চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থানরত মেজর জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উচ্চারণ ‘উই রিভোল্ট’ শুধু একটি বাক্য নয়; এটি স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম বাঙালি সামরিক বাহিনীর সহাবস্থানের প্রতীক। ওই বিদ্রোহের ফলে সারা দেশে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেরণা জাগে। আজও বিপ্লব উদ্যান সেই প্রতিরোধের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে
স্বাধীনতার ঘোষণা
২৬ মার্চ বিকালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। মেজর জিয়া নিজে ঘোষণা দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তা ছড়িয়ে দেন। তার কণ্ঠে উচ্চারিত ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ বাক্যটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা, বিশেষ করে আতাউর রহমান কায়সার সে সময় মেজর জিয়াকে সামনে আনার কৌশল গ্রহণ করেন। কারণ, একজন সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা জনগণের মধ্যে বেশি আস্থা ও সাহস জাগাত।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার শেষ অধ্যায় সার্কিট হাউস
স্বাধীনতার এক দশক পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াকে প্রথমে রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া (বর্তমান জিয়ানগর) এলাকার জাম্বুরী পাহাড়ে গোপনে দাফন করা হয়। পরে সরকার লাশ উদ্ধার করে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চন্দ্রিমা উদ্যানে সমাহিত করে। রাঙ্গুনিয়ার প্রথম দাফনস্থানে একটি স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী চট্টগ্রাম। ষোলশহরের বিদ্রোহ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঐতিহাসিক দলিলসমৃদ্ধ জিয়া স্মৃতি জাদুঘরÑসবকিছুই তার সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও দেশের স্বাধীনতায় অবদানের স্মারক হিসেবে আজও গুরুত্বপূর্ণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

