চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে প্রাকৃতিকভাবে বয়ে চলা খালের গতিপথ পরিবর্তন এবং পানি নিষ্কাশনের ড্রেন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগে আবুল খায়ের স্টিল মিলের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মিল কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনায় পাহাড়ি ঢল ও কারখানায় ব্যবহৃত পানি সরাসরি লোকালয়ে ঢুকে জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে অন্তত ২০০ ঘরবাড়ি।
শুধু তা-ই নয়, গ্রামের চলাচলের রাস্তাও ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে পা ফেলার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ পরিবারের হাজারো মানুষ। ইতোমধ্যে সমস্যার সুরাহা চেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন স্থানীয়রা।
এসবের প্রতিবাদে গতকাল রোববার সকালে মিলের মূল প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে চার ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। এ সময় তারা জলাবদ্ধতার জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করেন। তাদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের পথ খুলে দিতে বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও তারা কর্ণপাত করেনি। কারখানার ভেতরে পানির জন্য বাঁধ তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটি খাল দখল করে দেয়। তাছাড়া সড়ক দিয়ে সারা বছর তাদের ভারী লরি, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান চলাচল করলেও একবারের জন্য সংস্কারের প্রয়োজন মনে করেনি। রোববার বিক্ষোভকালে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলে ব্যারিকেড তুলে নেন তারা।
ঘরে কোমরপানি, বন্ধ উনুন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার কোথাও জলাবদ্ধতা না থাকলেও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের সোনাইছড়ি গ্রাম ও চৌধুরীঘাটা গ্রামে গত শনিবার রাতভর পাহাড়ি ঢলের পানি সরাসরি এসে আছড়ে পড়ে। ইউনিয়নের শীতলপুর (বগুলা বাজার) এলাকায়ও অনেক ঘর ও দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। এলাকার প্রায় ২০০ পরিবারের বাড়িঘর এখন পানির নিচে। এতে পরিবারগুলো সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছে। বাড়ির টিউবওয়েল ও চুলা ডুবে যাওয়ায় তাদের রান্নাবান্না ও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এসব এলাকার মানুষের ঘরে ঘরে হাঁটুপানি। নষ্ট হয়েছে খাবার, জ্বালানি, গৃহস্থালি জিনিসপত্রসহ মূল্যবান আসবাবপত্র।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. টিটু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেললাইনের পূর্ব ও দক্ষিণে একটি সরকারি খাল ছিল। কিন্তু মিল কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানার পরিধি বাড়াতে খালের গতিপথ পরিবর্তন করে কোন দিকে নিয়ে গেছে, তা গ্রামবাসীও জানে না। বগুলা বাজার খালটি তারা একপ্রকার দখলই করে নিয়েছে। অতীতে কোনো বছর এ এলাকায় পানি না উঠলেও এবার পুরো গ্রাম তলিয়ে গেছে। শিল্পের নামে আবুল খায়ের আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে এসেছে। আমরা এখন নিজের গ্রামেই ভাড়াটিয়া আর আবুল খায়ের যেন জমিদার।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈয়দ মো. বাপ্পী বলেন, জলাবদ্ধতার প্রতিবাদে আমরা রোববার সকালে আবুল খায়ের কারখানার সামনে বিক্ষোভ করি। পুলিশ এসে আমাদের শান্ত করে। আগেও অনেকবার অভিযোগ দিয়েছিলাম, কোনো প্রতিকার পাইনি।
তিনি আরো বলেন, খাল দখল করে ড্রেন বন্ধ করে তারা কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। এতে কারখানার সব পানি আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে। তারা ব্যবসা করছে আর আমরা পানিতে ডুবে মরছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এক সময় পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্রামে যে ড্রেনগুলো ছিল, তাও নিজেদের সুবিধার জন্য মাটিচাপা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ। উল্টো শনিবার রাতে মিলের ভেতরের বড় মাঠে জমে থাকা পানি লোকালয়ের দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
তবে শুধু জলাবদ্ধতা নয়, আবুল খায়ের স্টিল মিলের সামনের মূল সংযোগ সড়কটি এখন নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। ভারী লরি ও ট্রাক চলাচলের কারণে পুরো রাস্তায় প্রায় দুই ফুট কাদা জমে গেছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে পা ফেলাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে গ্রামে প্রবেশ করছে। দিনের পর দিন এমন অবহেলা আর ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়ার প্রতিবাদে স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেন।
গ্রামের বাসিন্দা মো. রুবেল জানান, আবুল খায়েরের বৈরী আচরণে আমাদের জীবন নাকাল। গ্রীষ্মকালে ধুলাবালির দূষণ, বর্ষায় বন্যা। সরকারি খাস পাহাড় ও জমি দখল করে গড়ে তোলা কারখানাই এখন স্থানীয়দের জন্য বড় অভিশাপ। প্রভাবশালীরা আবুল খায়ের গ্রুপের পক্ষে হওয়ায় আমরা মুখ খুললেও কোনো লাভ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফখরুল ইসলাম বলেন, আমাদের একটি প্রতিনিধিদল সেখানে পাঠানো হয়েছে। কেন জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি আবুল খায়েরের কারখানার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সড়ক কেউ এককভাবে দখলে রাখতে পারবে না।
এ বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের এজিএম ইমরুল কায়েস বলেন, পুরো চট্টগ্রাম পানিতে নিমজ্জিত। সীতাকুণ্ডও তার বাইরে নয়। অথচ জলাবদ্ধতার জন্য আমাদের দায়ী করে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে, যেটা মোটেও ভালো করেনি তারা।
তিনি বলেন, রাস্তাটি জেলা পরিষদের, চাইলেই আমরা সংস্কার করতে পারব না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

