চট্টগ্রামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনের নির্বাচনি ফলাফল এখনো স্থগিত রয়েছে। নির্বাচনের এক মাস পার হলেও দুই প্রার্থীর চূড়ান্ত ভাগ্য এখন আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল প্রকাশ করতে পারছে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর এবং চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে রিট মামলা চলমান রয়েছে। আপিল বিভাগের অন্তর্বর্তী আদেশে তারা নির্বাচনে অংশ নিলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুই আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে। তবে প্রাপ্ত ভোটে দুই আসনেই তারা এগিয়ে আছেন।
সারোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে প্রায় ২০১ কোটি টাকা এবং আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে। এ মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে ২৮ এপ্রিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মামলার রায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, রায়টি থেকে বোঝা যাবে—বিচার বিভাগ রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিতে পারছে কি না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থার প্রত্যাশা থেকেই আমরা আদালতের কাছে একটি স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক রায় আশা করি। জনগণের আস্থা
বজায় রাখার দায়িত্ব এখন বিচার বিভাগের ওপর।
তিনি আরো বলেন, ঋণখেলাপি শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি প্রতারণার শামিল। যারা ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেয় না, তারা আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য নন। এটি সংবিধান ও নির্বাচনি আইনের স্পষ্ট বক্তব্য। তাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আদালত আইন, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থ— এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রায় দেবেন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান আমার দেশকে বলেন, এই দুটি মামলাকে আমরা শুধু আইনি বিষয় হিসেবে দেখছি না। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের ভোটাধিকার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি বড় পরীক্ষা।
তিনি বলেন, ঋণখেলাপি বা আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের সংসদে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হবে। আদালত যদি এই ধরনের ব্যক্তির প্রতি নমনীয়তা দেখায়, তবে তা শুধু নির্বাচনি ব্যবস্থাকে নয়Ñসমগ্র মানবাধিকার পরিস্থিতিকেই দুর্বল করে দেবে। কারণ রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করে আবার জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার মধ্যে ভয়ানক নৈতিক বৈপরীত্য আছে।
দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী সারোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার মালিকানাধীন এনএফজেড টেরি টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানের নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় প্রায় ২০১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে তার প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
পরে উচ্চ আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ৩৮ হাজার ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন পান ৬২ হাজার ভোট।
নুরুল আমিন বলেন, আমরা আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন আইনের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত দেবে বলে আশা করি।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি থেকে বিজয়ী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক এশিয়া ও ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি অবস্থায় রয়েছে। সিআইবি রিপোর্টে ঋণখেলাপি না দেখানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার প্রার্থিতা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। হাইকোর্ট প্রথমে ১৯ ও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন। পরে মেয়াদ শেষ হলে তিনি আবার আদালত থেকে নতুন স্থগিতাদেশ নেন। নির্বাচন কমিশন জানায়, তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই আসনের ফলাফলও স্থগিত থাকবে।
নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ৪২ হাজার ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী পান ৮৯ হাজার ভোট।
আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী বলেন, আমরা আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছি। আশা করি আদালত আইনের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

