পাহাড়, মেঘ আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়ে গড়া বান্দরবান দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মেঘের আনাগোনা আর সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন আপন হাতে সাজিয়ে রেখেছে এই পাহাড়কন্যাকে। অপরূপ এই সৌন্দর্যের টানে প্রতি শীত মৌসুমেই এখানে ভিড় জমান দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
জানা গেছে, গত নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— এই তিন মাসজুড়ে জেলার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কোনো খালি কক্ষ ছিল না। পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোও তখন পার করেছে ব্যস্ত সময়। পর্যটকদের উপস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের পকেটে উঠছে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা। তবে ক্যালেন্ডারের পাতায় রমজান মাস শুরু হতেই বদলে গেছে সেই চিরচেনা দৃশ্য। তখন পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বান্দরবানের পর্যটন কেন্দ্রগুলো অনেকটাই নিরিবিলি হয়ে পড়ে।
এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে বসে নেই ব্যবসায়ীরা। পর্যটক কম থাকায় হোটেল-রিসোর্টগুলোতে সে সময় চলে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। ঈদের ছুটি ও পরবর্তী পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে অনেক রিসোর্টকে নতুনভাবে সাজানো হয়। কোথাও নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়, কোথাও আবার যুক্ত করা হয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। লক্ষ্য একটাই—পর্যটকদের জন্য আরো আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা।
বান্দরবান হোটেল-মোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং হোটেল আরণ্যের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মধ্যবর্তী সময়টায় ভালো ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হলিডে ইন ও ইকোসেন্স রিসোর্টের মালিক জাকির হোসেন জানান, শীত মৌসুমে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। রমজানে অতিথি কম থাকায় এই সময়টাতে হোটেল-রিসোর্টগুলোতে মেইনটেন্যান্সের কাজ করা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আসা পর্যটকদের ভালো সেবা দিতে পেরেছি বলে মনে করছি।
তিনি মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখন পর্যটননির্ভর। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দেশের পর্যটন স্পটগুলোকে জাগিয়ে তুলতে হবে। নতুন সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করবে—এমনটি প্রত্যাশা এই পর্যটন উদ্যোক্তার।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, বান্দরবানে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম বড় বাধা আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এবং জটিল ভিসানীতি।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বান্দরবানের পর্যটন উন্নয়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরি বলেন, পর্যটন খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি মনে করেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক মানের হোম-স্টে ও ইকো-রিসোর্ট গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সংস্কৃতিও বিশ্বদরবারে পরিচিতি পাবে।
শান্ত পাহাড় এখন যেন গভীর এক নিস্তব্ধতায় আগামীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। রমজান শেষে যখন আবারও দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদেরও পদচারণে মুখরিত হবে এই পাহাড়কন্যা—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন