গত ৩ দিন ধরে টানা ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরি নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দু'উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন একটি পৌর সভার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে প্রায় ৫০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে কোথাও কোমর ও হাঁটু পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার বেশকিছু ভ্যন্তরীণ গ্রামীণ সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ। ফলে এসব সড়কগুলো দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমুহেও পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার পানিবন্দি লোকজন গত দুদিন ধরে দুর্বিসহ জীবনযাপন করলেও তেমন কোনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছেনি।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলা, পৌরসভা ও নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার পানিবন্দি লোকজনের জন্য এ পর্যন্ত ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পানিবন্দি লোকজনের মাঝে শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরণ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। গত দুই দিন ধরে ইউএনও, এসি ল্যান্ডসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা পানিবন্দি লোকজনের কাছে গিয়ে তার খোঁজখবর অব্যাহত রেখেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এখনো থেমে থেমে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় মাতামুহুরি নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল বৃদ্ধি পেয়ে বুধবার সন্ধ্যায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ জনপদ। ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের বীজতলা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের ক্ষেত।
অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার বাসিন্দাদের বাড়িঘরে ঢলের পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্না ও তাদের পালিত গরু-ছাগল এবং হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এসব লোকজন। আবার পানিবন্দি লোকজনকে তাদের আত্মীয়স্বজনরা রান্না করা খাবার পৌঁছে দিতেও দেখা গেছে। বন্যাবকলিত লোকজনের অভিযোগ, তারা গত দুদিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করলেও কোনো জনপ্রতিনিধিই তাদের খোঁজখবর নিতে আসেননি।
গত কয়েক দিন ধরে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড়ধসের শঙ্কায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দফায় দফায় মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান বলেন, তার ইউনিয়নের ডেইঙ্গাকাটা, শান্তির বাজর, বিবিরখিল, পহরচান্দা, রসুলাবাদ, হিন্দুপাড়াসহ আরো বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে অন্তত ১৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
সোনাইছড়ি নদীতে তীব্র পাহাড়ি ঢলের তোড়ে এ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ছমন্নির ঘাটা এলাকায় চলাচলের সড়ক ভেঙে গিয়ে লোকালয়ে ঢলের পানি ঢুকছে। সোনাইছড়ি নদীর অববাহিকায় পানির স্রোত বাড়তে থাকায় এ ইউনিয়নের ৩, ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নদী তীরবর্তী জায়গাসমুহ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এছাড়া উপজেলার আরো বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তাদের ইউনিয়নসমূহে নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ওই সব ইউনিয়নসমূহে আরো অন্তত ৩৫ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে দুই উপজেলার বেশির ভাগ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে অন্তত ৫০ হাজার লোক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্ব স্ব এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী লোকজনকে মাইকিং করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যারা এখনো প্রশাসনের নজর এড়িয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করছেন তাদেরকেও সরিয়ে নেওয়ার জন্য স্ব স্ব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও আরো বলেন, এ পর্যন্ত চকরিয়া উপজেলা, পৌরসভা ও মাতামুহুরি উপজেলার পানিবন্দি লোকজনের জন্য ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব লোকজনকে শুকনো খবারও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া মাতামুহুরি নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি যাতে দ্রুত নিচের দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর পানি নিষ্কাশনের স্লুইসগেটগুলোর কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলার পাশাপাশি যে কোনো পরিস্থিতিতে মোকাবিলার জন্য সব পক্ষকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান চকরিয়া ও মাতামুহুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীন দেলোয়ার।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

