আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

উখিয়ায় ইনানী বন ধ্বংসের মহোৎসব

মোহাম্মদ ইব্রাহিম মোস্তফা, উখিয়া (কক্সবাজার)

উখিয়ায় ইনানী বন ধ্বংসের মহোৎসব
ইনানী রেঞ্জের পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে স্থাপনা। ছবি: আমার দেশ

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়ার ইনানী রেঞ্জে বনাঞ্চল ধ্বংসের মহোৎসব চলছে। বনরক্ষক ও একটি ভূমিখেকো সিন্ডিকেটের যোগসাজশে অবাধে চলছে পাহাড় কাটা। এতে বনরক্ষকরাই বন উজাড় ও ধ্বংস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বনভূমি বিক্রি ও ঘুস বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত তিন বছরে স্বৈরাচার সরকার আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বনাঞ্চল ধ্বংস করে আসছে। বিষয়টি জানার পরও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নীরব ভূমিকা পালন করছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইনানী রেঞ্জের আওতাধীন মনখালী, রাজাপালং, জালিয়াপালং ও ছোয়ানখালী বিটে ছোট-বড় গাছ কেটে বিক্রি, ঝাউগাছ নিধন, পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি, বনভূমি দখল ও বেচাকেনা, করাতকল পরিচালনা, বালু ও মাটি উত্তোলন এবং বনভূমিতে নতুন ঘর নির্মাণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, যেখানে বন বিভাগের ইনানী রেঞ্জের একাধিক বিট কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিন জালিয়াপালং বিট এলাকায় দেখা গেছে, বনাঞ্চল উজাড় করে বিশাল পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন। রাজাপালং বিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিছুর রহমান এসব অনিয়ম দেখেও রহস্যজনক কারণে নীরব রয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

রাজাপালং বিটে দেখা যায়, বড় বড় পাহাড় কেটে দালানঘর নির্মাণ, বন কেটে পানের বরজ ও ব্যক্তিগত বাগান তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য বিটের অবস্থাও অভিন্ন।

তথ্যসূত্র জানায়, গত তিন বছরে পাহাড় কাটার সময় অন্তত চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বন উজাড়ের কারণে দুটি হাতির মৃত্যু এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়েছে।

ইনানী রেঞ্জের বনভূমির আয়তন প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর। এখানে অবস্থিত ২৯৩৩ দশমিক ৬১ হেক্টর আয়তনের শেখ জামাল জাতীয় উদ্যান কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ।

জালিয়াপালং জুম্মাপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, এ এলাকার পাতিনেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে শত শত বছরের পুরোনো পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। এখন একটি পাহাড়ও অবশিষ্ট নেই।

ছোয়ানখালী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলম বলেন, রাতের অন্ধকারে গাছ কাটা, বালু ও মাটি পাচার করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়।

রাজাপালং তুতরবিলা এলাকার কৃষক আমিন বলেন, দুই বছর আগেও এখানে হাতি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল। কিন্তু গত তিন বছরে এখানে হাজারখানেক ঘর গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘর থেকে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে রেঞ্জারের নাম ব্যবহার করে।

ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল-আমিন আমার দেশকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি সরাসরি জড়িত নই। এখানে ছোটখাটো কিছু অনিয়ম হয়েছে আবার অনেক উন্নয়নমূলক কাজও হয়েছে। আমরা সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে মামলাও করেছি।’

অন্যদিকে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ও জালিয়াপালং বিট কর্মকর্তা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে এসব অনিয়মসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে প্রতিবেদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন।

দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-মামুন আমার দেশকে বলেন, ‘আপনার মাধ্যমেই এসব বিষয়ে অবগত হয়েছি। তদন্তে যদি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন