ভোট আসে, সরকার বদলায়—কিন্তু বদলায় না রায়পুরের মেঘনার চরের হাজারো মানুষের জীবনসংগ্রাম। নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বছরের পর বছর বসবাস করেও মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। প্রতিটি নির্বাচনের আগে নানা প্রতিশ্রুতিতে আশার আলো জ্বলে উঠলেও ভোট শেষে সেই আলো মিলিয়ে যায় হতাশার অন্ধকারে।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে মেঘনা নদীর চরাঞ্চল। নদীর বুকে জেগে ওঠা এসব চরে বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে। তবে টিকে থাকার লড়াই এখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা। নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকট এবং অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা—এসব সমস্যাই চরবাসীর নিত্যসঙ্গী।
উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে মোল্লারহাট, হাজিমারা, চান্দারকাল ও সাজু মোল্লার মাছঘাট পর্যন্ত সিএনজি চালিত অটোরিকশায় যেতে হয়। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রায় ৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় চরে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বাড়লে সময় কিছুটা কম লাগে। তবে ঝড়-দুর্যোগ বা বৈরী আবহাওয়ায় এই নৌপথই হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চরবাসীর যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই নৌকা।
চরাঞ্চলে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় চড়ে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে নদী উত্তাল থাকলে অনেক সময় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে সময় ও ঝুঁকি—দুই-ই বাড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসার অভাবে মাঝে মধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
নদীভাঙন চরবাসীর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। প্রতিবছরই মেঘনার ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গবাদিপশু হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকে। স্থায়ী বাঁধ বা কার্যকর নদীশাসন ব্যবস্থা না থাকায় অনিশ্চয়তার মধ্যেই বসবাস করতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্বাচন এলেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা চরাঞ্চলে যান এবং উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেন। রাস্তা নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন আশ্বাস শোনা যায়। কিন্তু ভোট শেষ হলে আর সেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা যায় না।
চরবাসীর দাবি, টেকসই নদীশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ ও স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সম্ভব। পাশাপাশি দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র ও সরকারি সহায়তা বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ভোটের সময় স্বপ্ন দেখেন চরবাসী, কিন্তু বাস্তবতা থেকে যায় একই রকম। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়—কিন্তু মেঘনার চরের মানুষের জীবনসংগ্রাম যেন বদলায় না। উন্নয়নের মূলধারায় কবে যুক্ত হবে এই জনপদ—সেই প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে উত্তরহীন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

