নবীনগরে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে স্বপনের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’

জালাল উদ্দিন মনির, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

নবীনগরে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে স্বপনের ‘গুঞ্জন পাঠাগার’
সুহাতা গ্রামে গুঞ্জন পাঠাগার

সব গল্প শিরোনামে আসে না। কিছু গল্প নীরবে মানুষের জীবন বদলে দেয়। আর এসব মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার পেছনে স্মরণীয় হয়ে আছে ‘গুঞ্জন পাঠাগার’। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় সুহাতা গ্রামে অবস্থিত এ পাঠাগারের কারিগর বই মজুরখ্যাত স্বপন মিয়া।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে জানা গেছে, স্বপন সুহাতা গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে। মাত্র দেড় বছর বয়সেই মারা যান বাবা। সংসারের হাল ধরেন মা রাজিয়া খাতুন। তিনি মাটি কাটার কাজ করে সন্তানদের লালন-পালন করেছেন। সংসারে তিন ছেলে। দুজন রিকশাচালক। সবার ছোটো স্বপন।

সংসারের অভাব অনটনের কারণে দুই ভাই স্বপনকে পাঠাগার ছাড়তে বলেন। কিন্তু স্বপন পরিবার ছেড়ে ধরেছেন পাঠাগার। মা তাকে সঙ্গ দেন। তিনি পাঠাগারের জন্য দেন সোয়া দুই শতাংশ জায়গা। এনজিও থেকে ৮ হাজার টাকা ঋণ নেন। বসতভিটায় একচালা টিনের ঘরে ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ ‘এসো বই পড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি’ স্লোগানে মাত্র তিনটি বই নিয়ে শুরু হয় যাত্রা।

এ পাঠাগারকে বাঁচিয়ে রাখতে শুরুর পথচলা ছিলো ত্যাগ আর আত্মোৎসর্গে ভরা। স্বপন ঘুরে ঘুরে, পথে পথে কিংবা মোড়ে মোড়ে বিক্রি করেছেন পান-সিগারেট। দিনমজুরির কাজ করেছেন, চালিয়েছেন রিকশা। তার ঘামে আর শ্রমে গড়া এ পাঠাগার এখন প্রায় ১৫ হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ এক পাঠশালা।

স্বপনে সরব গুঞ্জনের পাঠকরা

পড়াশোনায়ও পিছিয়ে পড়েননি স্বপন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে জেলার কসবার বায়েক শাহ আলম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক তিনি। কলেজ থেকে বেতনের বেশিরভাগই ব্যয় করেন পাঠাগারের কাজে।

২০০৪ থেকে ২০২৬। একচালা টিনের থেকে এখন দুতলা ভন। ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যুর পর গুঞ্জন পাঠাগারই স্বপনের সবকিছু।

২২ বছর ধরে সুহাতা গ্রামে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে গুঞ্জন পাঠাগার। বিশেষ করে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের একমাত্র পাঠাগারটি। প্রতি শুক্রবার বসে পাঠচক্র। শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন করা হয় সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা।

স্বপন মিয়া আমার দেশকে বলেন, সমাজে আমার মতো অনেকেই আছে যারা বই কিনে পড়তে পারে না। শুধুমাত্র টাকার অভাবে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তাদের কথা চিন্তা করেই ২০০৪ সালে গুঞ্জন পাঠাগারের সৃষ্টি।

তিনি আরো বলেন, আমি একটা মানুষ না থাকলে কিছু হবে না। কিন্তু এই পাঠাগারটি না থাকলে এলাকার অনেক ক্ষতি হবে। এই পাঠাগারে বই পড়ে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। অনেকে ভালো চাকরি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। সুহাতা গ্রাম আলোকিত হয়েছে গুঞ্জন পাঠাগারের আলোতে। তাই আমার পুরো জায়গাটি পাঠাগারের নামে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

গুঞ্জনে পড়তে আসা পাঠকরা
গুঞ্জনে পড়তে আসা পাঠকরা

তিনি আরো বলেন, গুঞ্জন আপনাদের সকলের। আপনাদের সহযোগিতায় গুঞ্জন এ পর্যায়ে এসেছে। গুঞ্জনের হিসেব নেওয়ার অধিকারও আছে সকলের। সব সময়ই খোলা থাকবে গুঞ্জনের হিসেবের খাতা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি টাকার হিসেব আছে গুঞ্জনের ডায়েরিতে।

প্রিন্সিপাল কামরুল হুদা পথিক বলেন, স্বপন মিয়া গুঞ্জনকে শুধু একটি বইয়ের সংগ্রহই করতে চায়নি। চেয়েছে বই পড়া ও আমাদের সংস্কৃতিকে জাগিয়ে রাখতে। সেটি দিনে দিনে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে।

নবীনগর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ কান্তি কুমার ভট্টাচার্য বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি স্বপন এবং গুঞ্জনকে নিয়ে গর্বিত।

নবীনগর মহিলা ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিউলি পারভীন বলেন, নবীনগর তথা পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য আলোর দিশারি হয়ে দাঁড়িয়েছে গুঞ্জন পাঠাগার। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও বঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতে কাজ করছে পাঠাগারটি।

সুহাতা গ্রামের রমজান খান জানান, পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না হওয়ায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে তখন বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে স্বপন তাকে গুঞ্জন পাঠাগারে নিয়ে আসেন। এখন এই পাঠাগারে থেকেই নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনার্স শেষ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাস্টার্স করছেন।

নবীনগরের আঞ্চলিক কথার সভাপতি রানা জালাল বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় শিশু-কিশোরদের কথা চিন্তা করে এমন পাঠাগার করায় শিশু বয়স থেকেই নতুন প্রজন্মের বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

গুঞ্জনে আসা শিক্ষার্থীরা জানান, স্কুল কলেজের লাইব্রেরি গুলোতে নিদিষ্ট কিছু বই রয়েছে। কিন্তু গুঞ্জনে ধর্মীয় গ্রন্থসহ সকল বিষয়ের বই রয়েছে। গুঞ্জন একটি বইয়ের মহা সাগর। এখানে শুধু বই পড়া হয় না। দেওয়া হয় নৈতিকতার শিক্ষাও, সে কারণে আমরা গুঞ্জনে আসি।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন