ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনেই ভূমিধস বিজয় হয়েছে বিএনপির। দুটি ছাড়া সবকটি আসনে দলটির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয় নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। কেউ কেউ প্রতিন্দ্বন্ধী জামায়াত প্রার্থীকে হারিয়েছেন অর্ধ লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে। এবার গঠিত হতে যাওয়া বিএনপি সরকারের মন্ত্রী পরিষদের আলোচনায় আছেন চট্টগ্রামের চার মুখ। এদের মধ্যে বিজয়ী তিনজন তরুণ ও নতুন মুখ। আরেকজন দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো হেভিওয়েট প্রার্থী। এরা হলেন, চট্টগ্রাম-৫ আসনে জয়ী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-১০ আসনে জয়ী সাঈদ আল নোমান ও চট্টগ্রাম-৭ আসনে জয়ী হুম্মাম কাদের চৌধুরী। এছাড়াও টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হতে পারেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার।
দলীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের ১৪টি আসনের মধ্যে এই তিন তরুণ নেতা সবচেয়ে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিত্ব। বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী মীর নাছিরের ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিগত সময়গুলোতে বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছেন। ৫ আগস্টের আগে হাসিনা বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামেও তার অংশগ্রহণ ছিলো ব্যাপক। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমের সঙ্গে তার সাংগঠনিক কাজে প্রশংসনীয় সমন্বয় ছিল। এ কারণে তিনি মন্ত্রী পরিষদে থাকতে পারেন। আর সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাঈদ আল নোমান ও সাবেক মন্ত্রী, তথাকথিত যুদ্ধাপরাধে ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীও থাকতে পারেন নতুন মন্ত্রী সভায়।
বিএনপি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে সাঈদ আল নোমান ১ লাখ ২২ হাজার ৯৭৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার সাথে জামায়াত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৪৬ হাজারের বেশি। তার নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রচারণায় শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চট্টগ্রামের বেসরকারি ইষ্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা তিনি ও তার প্রয়াত বাবা। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তরুণদের ভোট টানতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। দলের জন্য সাধারণ মানুষকে টানতে তার নতুন নতুন আইডিয়া, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নেতৃত্ব তৈরি প্লাটফর্ম সৃষ্টি, সোশ্যাল লিডার তৈরির ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলাও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে দলে। তাছাড়াও ক্লিন ইমেজের তরুণ, সজ্জ্ন নেতা হিসেবে তার রয়েছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। অনেকে মনে করেন, তারুণ্য নির্ভর রাজনীতিতে আগামী দিনে সাঈদ আল নোমান হতে পারেন বিএনপির অন্যতম থিংক ট্যাঙ্ক। এজন্য তাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুক্ত করা হতে পারে।
এদিকে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন দু:সময়ে চট্টগ্রাম বিএনপিকে সুসংগঠিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, উত্তর জেলা, মহানগর ছাত্রদলের কমিটি গঠনে তার ভূমিকা ছিল। মহানগর বিএনপি ও যুবদল, হাটহাজারী বিএনপিকে সংগঠিত করতে এবং বিএনপির বিভিন্ন উপজেলায় কোন্দল কমাতেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল। তার বাবা বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক চসিক মেয়র।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের ব্যারিস্টার ক্লিন ইমেজের রাজনীতিক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। বিশেষ করে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সময় গুম হয়ে আয়না ঘরে দীর্ঘ দিন থাকা, বাবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে ওঠার চেষ্টা, গ্রামের মানুষের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় স্বাভাবিক চলাফেরা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য রেখে বেশ আলোচনায় ছিলেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলি নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ, পরিবেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, চাঁদাবাজির বিষয়ে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে দল ও দলের বাইরে প্রশংসা কুড়ান তিনি। তাকেও এবারের মন্ত্রী সভায় ঠাঁই দেওয়া হতে পারে মনে করেন চট্টগ্রাম বিএনপির অনেকে।
এদিকে চট্টগ্রাম থেকে টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার আলোচনায় আছেন উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার। তিনি এর আগে ২০০৫ সালে ওমানের রাষ্ট্রদূত ও ১৯৯৬ সালে রাউজানের সংসদ সদস্য ছিলেন। প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজনও ছিলেন বিএনপির এই নেতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাকে ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে তাকে সরে দাঁড়াতে হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোর পুরস্কার পেতে পারেন গোলাম আকবর খন্দকার। এছাড়াও হাতিয়ায় হান্নান মাসউদের কাছে পরাজিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর উচ্চ কক্ষের সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, মাহবুবের রহমান শামীম অতীতে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন চট্টগ্রামে। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে যখন জেলায় জেলায় ভাঙন, বিরোধ চলছিল তখন শামীম ছিলেন ত্রাতা। উত্তর, দক্ষিণ জেলা ও মহানগরের নেতারা যখন পদ নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েন তখন লম্বা সময় ধরে সভা, সমাবেশ, মিছিলে শামীম ছিলেন অন্যতম সমন্বয়ক। আর এবার মনোনয়ন চেয়েও পাননি নগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তারে পোড় খাওয়া নেতা তিনি। তার কমিটির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বর্তমানে চসিক মেয়র। এছাড়াও একই ব্যাচের ও জুনিয়র অনেক নেতা এবার এমপি হয়েছেন। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে তাকে ক্ষোভও প্রকাশ করতে দেখা যায়। এবার উচ্চ কক্ষে তাকে ও শামীমকে দল মূল্যায়ন করতে পারে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজিমুর রহমান জানান, চট্টগ্রাম বহু বছর আগে থেকেই বিএনপির ঘাঁটি। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যতবার মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছে ততবারই বিএনপির ভুমিধ্বস বিজয় হয়েছে এই বন্দর নগরীতে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিএনপিও অতীতে যতবার ক্ষমতায় এসেছে রাষ্ট্র পরিচালনায় চট্টগ্রামকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আমরা আশা করবো এবারো নতুন সরকারের মন্ত্রিপরিষদে চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত একাধিক জনপ্রতিনিধির দেখা মিলবে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আবুল হাসেম বক্কর জানান, চট্টগ্রামের ১৬ টি আসনের মধ্যে ১৪ টিতেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এককথায় বলা যায় পুরো চট্টগ্রামের মানুষই দেশ নায়ক তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছে। প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক যোগ্য প্রার্থী থাকলেও সবাই দলের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ছিলো। তাই উচ্চ কক্ষে মূল্যায়নের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্ত্রী পরিষদের পাশাপাশি উচ্চকক্ষেও চট্টগ্রামের ত্যাগী নেতারা মূল্যায়িত হবেন বলে জানান আবুল হাসেম বক্করের।
বিএনপি পন্থী পেশাজীবী নেতা সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী জানান, চট্টগ্রামের মানুষ বিএনপিকে উজাড় করে ভোট দিয়েছে। কারণ বিএনপির কাছে তাদের প্রত্যাশা আছে। বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করলেও সময় স্বল্পতায় তিনি তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তারেক রহমান সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। এটা বাস্তবায়ন করতে হলে বেশ কয়েকটি সরকারি দফতরের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত করতে হবে। আর এজন্য মন্ত্রী পরিষদে চট্টগ্রামের অংশীদারিত্ব থাকা প্রয়োজন। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এবার অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। দলের সিনিয়র পোড়খাওয়া নেতা যেমন এমপি হয়েছেন। নবীন, নির্যাতিত ও শিক্ষানুরাগী নেতারাও সংসদে গেছেন। সবমিলিয়ে বিষয়গুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেন দলের চেয়ারম্যান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

