চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন দুটি পদ সৃষ্টি করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইছে বন্দর পরিচালনা পরিষদে নতুন দুটি পদ সৃষ্টি করে মন্ত্রণালয় থেকে দুই কর্মকর্তাকে বন্দরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে।
তাদেরকে বোর্ড সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। শধু তাই নয়, বর্তমান বোর্ড সদস্যরা বন্দর ভবনে অফিস করলেও নতুন সদস্যরা অফিস করবেন ঢাকায়। আর বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না বন্দরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তাদের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় যাবতীয় সিদ্ধান্তই চেয়ারম্যান ও চার সদস্যের বোর্ড গ্রহণ করে। বোর্ডের সদস্যরা রাজধানীতে বসে অফিস করলে সৃষ্টি হবে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এতে করে পিছিয়ে পড়বে বন্দরের অপারেশনাল কাজ।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বন্দর আইন ২০২২ অনুযায়ী এই বন্দর একজন চেয়ারম্যান ও চারজন বোর্ড সদস্যের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। চেয়ারম্যানের বাইরে বোর্ড সদস্যদের মধ্যে সদস্য (প্রশাসন), সদস্য (অর্থ), সদস্য (হারবার ও মেরিন) এবং সদস্য (প্রকৌশল) রয়েছেন। এদের মধ্যে দুজন নৌবাহিনী থেকে আসা আর বাকি দুজন সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তা।
বন্দরের মূল চারটি সেক্টরের প্রধান হিসেবে এই চার কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। আইন অনুযায়ী দাপ্তরিক কাজে চেয়ারম্যানকে রাজধানীসহ মাঝেমধ্যে দেশের বাইরে থাকতে হয়। এ সময় ওই চার শীর্ষ কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক বন্দরের কাজ মনিটরিং করেন।
জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নতুন দুটি সদস্যপদের একটি হবে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে, অন্যটি দেওয়া হবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। নতুন সদস্যরা বোর্ড মেম্বার হলেও তারা অফিস করবেন নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে।
বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, এতে বন্দরের নিয়মিত কার্যক্রমের ওপর তাদের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না। সুনির্দিষ্ট সেক্টরের দায়িত্ব না থাকায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের ওপর থাকবে না তাদের কোনো প্রভাব। এমনকি বন্দরের কাজ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা না থাকায় গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে, যা বন্দরের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বন্দর সূত্র আরো জানায়, বর্তমান আইনে নতুন এ দুই পদ সৃষ্টি করার সুযোগ নেই। আর এ কারণে আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। গত ১৪ ডিসেম্বর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘চবক’ শাখা থেকে এ বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করে আইন সংশোধনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। নতুন আইনটি ‘বন্দর আইন, ২০২৫’ নামে স্বীকৃতি পাবে।
ইতোমধ্যে আইনটি যাচাইবাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে আহ্বায়ক, উপসচিবকে (চবক) সদস্যসচিব এবং চট্টগ্রাম বন্দরের চারজন কর্মকর্তাকে সদস্য করে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়েছে। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নির্বিঘ্নে বাস্তবায়ন করতে এই কমিটির মধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে আরো দুজনকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (প্রশাসন) জাফর আলম জানান, ২০১৭ সাল থেকে একাধিকবার মন্ত্রণালয়ের একটি চক্র চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ডে তাদের দুজন সদস্য ঢোকানোর চেষ্টা করে আসছে। বন্দরের আপত্তির মুখে বারবারই এই উদ্যোগ বন্ধ করতে হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটু রদবদল হলেই ওই চক্র এই উদ্যোগ নিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, তাদের ধারণা, বোর্ড সদস্য হতে পারলেই বন্দরকে নিয়ন্ত্রণ করা যবে। সরকারকেও বুঝতে হবে চা বোর্ডের সদস্য আর বন্দরের বোর্ড সদস্য এক বিষয় নয়। বন্দর পরিচালনার স্বার্থে প্রতিদিন সকালে বোর্ডকে বসতে হতে পারে। কয়েকজন সদস্য ঢাকায় থাকবেন আর কয়েকজন চট্টগ্রামে অফিস করবেন-- এভাবে বোর্ড চলবে না।
জাফর আলম আরা বলেন, বোর্ডে সংস্কার যদি আনতেই হয়, তাহলে সিভিল ওয়ার্ক-সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কর্মকর্তাদের আনা উচিত। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বসিয়ে দিলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। আজ পর্যন্ত বোর্ডের কারণে কোনো কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এমন কোনো ইস্যু তৈরি হয়নি। তাহলে সক্ষমতা বাড়ানোতে মনোযোগ না দিয়ে মাথাভারী প্রশাসন তৈরির উদ্যোগ বন্দরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে জানান তিনি।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি বন্দর স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিচালিত হতে এর স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা প্রয়োজন। যে বন্দর যত বেশি দাপ্তরিক জটিলতামুক্ত, সেই বন্দরের সক্ষমতা তত বেশি। পৃথিবীর বড় বন্দরগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে সাধারণ চারটি কারণ। তা হলো-- অটোমেশন, প্রাইভেটাইজেশন, দক্ষ ম্যানেজমেন্ট ও ফ্লেক্সিবিলিটি। এই চার কারণের প্রধান অন্তরায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি স্তিমিত হয়ে পড়ে। তাই যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে মাথাভারী প্রশাসনকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কিন্তু নতুন বোর্ড সদস্য নিয়োগ হলে চট্টগ্রাম বন্দরও মাথাভারী হবে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে আইন সংশোধনের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা কয়েকটি পয়েন্ট নিয়ে কাজ করছে। তবে ওই কমিটি এখনো কোনো সুপারিশ দেয়নি। বোর্ড সদস্য বাড়ানোর কোনো ইস্যুতে তারা সুপারিশ করবে কি না, সে ব্যাপারে আগে থেকে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। তবে বন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা আসে এমন কোনো উদ্যোগ কেউ নেবে না বলেও জানান তিনি।
এসআই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

