আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চট্টগ্রাম–৮ আসন এনসিপিকে ছেড়ে দেয়ায় জামায়াত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম–৮ আসন এনসিপিকে ছেড়ে দেয়ায় জামায়াত নেতাকর্মীদের ক্ষোভ

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের ভেতর নতুন সমীকরণ তৈরি করলেও চট্টগ্রাম–৮ আসন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিকে ছেড়ে দেয়ায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামী ও দলটির প্রার্থী ডা. আবু নাসের। বোয়ালখালী–পাঁচলাইশ–চান্দগাঁও নিয়ে গঠিত এ আসনে দলটির স্থায়ী ভোটব্যাংক, সংগঠিত নেটওয়ার্ক ও পরিচিত মুখকে সামনে রেখে জামায়াত জোটের ভেতরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। এনসিপির আগ্রাসী চাওয়া–পাওয়ার পরও আসনটি বণ্টনে ছাড় না দেওয়ার মনোভাব স্পষ্ট করেছে দলটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ আসনে জামায়াতের রাজনৈতিক কাজের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক, স্বেচ্ছাসেবী ত্রাণ কার্যক্রম, স্থানীয় ধর্মীয়–সামাজিক সংযোগ-সব মিলিয়ে এ এলাকায় দলটির একটি স্থায়ী ভোট ভিত্তি তৈরি হয়েছে। বিগত দেড় বছরে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও মাঠমুখী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে দলটি। দলীয় সূত্র বলছে, পাঁচলাইশ–চান্দগাঁওয়ের শহুরে জনগোষ্ঠী ও বোয়ালখালী এলাকার ধর্মীয়–গ্রামীণ জনপদের ওপর ভিত্তি করেই জামায়াত এ আসনকে ‘নিরাপদ আসন’ ধরা হয়ে থাকে। সে কারণেই জোটের ভেতর এনসিপির চাপ থাকা সত্ত্বেও আসন ছাড়ার প্রশ্নেই নেই দলটি।

বিজ্ঞাপন

জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি মো. মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রার্থী ডা. আবু নাসের এই আসনেরই মানুষ। জন্মলগ্ন থেকেই এখানে বড় হয়েছেন, বহু বছর ধরে রাজনীতি করছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুধু গত দেড় বছর নয়-অনেক আগে থেকেই তিনি এলাকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে এনসিপির প্রার্থী এত দিন চট্টগ্রাম–১৩ আসনে কাজ করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েক সপ্তাহ হলো চট্টগ্রাম–৮ আসনে সক্রিয় হয়েছেন। তিনি মূলত ‘বায়েস্ট’ হয়ে কাজ করছেন। স্থানীয়ভাবে তার ভিত্তি নেই।

মোরশেদুলের মতে, ডা. আবু নাসের ছাড়া এ আসনে অন্য কাউকে দাঁড় করানো হলে আসনটি কার্যত বিএনপির হাতে তুলে দেওয়ার শামিল হবে।

জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাসের: পরিচিতি ও নেটওয়ার্কের ভরসা

জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসের স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় চিকিৎসক। চিকিৎসাসেবা, রমজানে ইফতার, কোরবানি মাংস বিতরণ, ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে বহু বছর ধরে যুক্ত আছেন তিনি। দলটির নেতাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

ডা. নাসের বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, গ্রামের মানুষ থেকে শহুরে ভোটার-সব জায়গা থেকেই দারুণ সাড়া পাচ্ছি। ঘরে ঘরে যোগাযোগ করছি। মানুষ আশ্বস্ত করছে।’

অন্যদিকে এনসিপি জোটের ভেতর চট্টগ্রামের এই আসনটি দাবি করছে প্রকাশ্যেই। দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফ মনোনয়ন নেওয়া তারপর মাঠে নামার পর আলোচনায় এসেছে দলটি। যদিও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল, তবু জোটের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করে ‘নতুন মুখ’ নিয়ে ভোটে লড়তে চায় তারা।

এ বিষয়ে জানতে জোবাইরুল আরিফের মুঠোফোনে বারবার কল দিয়েও পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মিলেনি।

তবে পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইশতিয়াক বলেন, ‘জামায়াতের এলাকাবাসী ভোটবক্তি শক্ত। নতুন দল এসে এটা ভাঙা সহজ নয়। এনসিপি চাপ তৈরি করছে বটে, কিন্তু আসন ছাড়বে বলে মনে হয় না জামায়াত। আর এখানে জামায়াতের আবু নাসের ভাই নির্বাচন করলে, বিএনপির জন্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হবে’।

এদিকে বিএনপির নগর আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এ আসনে প্রার্থী। দীর্ঘদিন সংগঠন দুর্বল থাকলেও ত্রাণ কার্যক্রম, গণসংযোগ এবং গ্রামীণ জনপদে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছেন বলে মনে করেন দলীয় নেতারা।

এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘জনগণের কল্যাণের রাজনীতি করি। ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার দেখছি। বোয়ালখালীর মানুষের সাড়া আমাদের আশাবাদী করছে।’

জলাবদ্ধতা, খাল–ড্রেন দখল, ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম, মাদক সমস্যা, কিশোর অপরাধ-এসব স্থানীয় ইস্যুতে ভোটারের মনোযোগ বেশি। পাঁচলাইশের মধ্যবিত্ত ভোটাররা রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়ে জীবনযাত্রার সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দেন। চান্দগাঁওয়ের ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী ভোটাররা দলীয় সংগঠনের ওপর নির্ভরশীল। বোয়ালখালীতে ধর্মীয় অনুভূতি ও ব্যক্তিগত ইমেজ বড় ফ্যাক্টর।

এমন বাস্তবতায় সাংগঠনিকভাবে গুছানো অবস্থান এবং শক্তিশালী ভোটব্যাংকের কারণে আসন ছাড়তে নারাজ জামায়াত। দলটির ধারণা, মাঠের প্রতিযোগিতা যতই হোক, কোর ভোট ধরে রাখতে পারলে জয় ক্ষতির মুখে পড়বে না।

এদিকে আসনে বৃহত্তর সুন্নি জোটের একক প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সৈয়দ হাসান আজহারি। সুন্নি ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হলেও প্রার্থী হিসেবে তিনি এখনও অপরিচিত। এলাকায় কার্যকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান না থাকায় অনেক ভোটার তার পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন।

স্থানীয় নেতাদের মতে, শেষ মুহূর্তের সংগঠিত প্রচারণা এবং জাতীয়–ধর্মীয় ইস্যু ঘিরে ভোটারদের একটি অংশ তাদের দিকে আসতে পারে। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, আজহারীকে এখনও বেশ পিছিয়ে থেকেই লড়াই শুরু করতে হচ্ছে।

সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম–৮ আসনের রাজনীতি এখনো চূড়ান্ত অনিশ্চয়তায় ভরা। জোটে আসন নিয়ে টানাপড়েন, বিএনপির সক্রিয় মাঠযাত্রা এবং এনসিপির আগ্রাসী উপস্থিতি-সব মিলিয়ে সমীকরণ বদলে যেতে পারে যেকোনো সময়। তবে দলীয় সূত্র বলছে, জোটের চাপ যাই হোক, সংগঠিত ‘গুছানো আসন’ হিসেবে জামায়াত এ আসন ছাড়তে রাজি নয়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় তাদের আত্মবিশ্বাসই এখন মূল ভরসা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন