সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী। সোমবার ভোর থেকে প্রায় ৩ হাজার সদস্যের এই অভিযান শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গুঞ্জন উঠেছে, ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণকর্তা শীর্ষ সন্ত্রাসী ও র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মো. ইয়াছিন অভিযান শুরুর আগেই বোরকা পরে পালিয়েছেন৷ ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের একটি গোপন পথ ব্যবহার করে তিনি নারী বেশে সরে পড়েন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব কর্মকর্তা আব্দুল মোতালেব ভূঁইয়্যা হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে জোর দিচ্ছে যৌথ বাহিনী। ওই মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ফারুকসহ বেশ কয়েকজন আসামি রয়েছেন।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, প্রশাসনের অন্যতম টার্গেট ইয়াছিন ভোরের আলো ফোটার আগেই একটি গোপন পথ ব্যবহার করে চলে যান। এ সময় তাকে বোরকা পরিহিত অবস্থায় দেখেন কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন প্রতিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর টের পেয়ে বোরকা পরে পালিয়ে যান। কখনো তিনি সিএনজি অটোচালকে বেশেও ছাড়েন দুর্গম ওই এলাকা৷
জানা যায়, অভিযান পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে ওপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগেই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে কেউ অভিযান শুরুর খবর পেয়ে এলাকা ছাড়তে না পারে।
অভিযানে অংশ নেওয়া একটি সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে একাধিক পাহাড়ি ছড়া, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এসব স্থানকে অনেক সময় অপরাধীরা আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করে। তাই সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কোথাও কোথাও পাহাড়ি পথ এতটাই সরু যে একসঙ্গে কয়েকজনের বেশি চলাচল করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয় স্থানীয় এক যুবদল নেতা। পরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের দুই গ্রুপে সংঘর্ষ হয় দফায় দফায়। পরবর্তীতে গত বছরের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গল সলিমপুর থেকে চার সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়৷ এরপর এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন৷ তিনি তার বাহিনী নিয়ে ওই এলাকায় ব্যাপক লুটপাট চালা। মূলত ইয়াছিন জঙ্গল সলিমপুর থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরের এলাকা আলীনগরের অঘোষিত রাজা। তিনি আবাসিক সমিতি নাম দিয়ে হাজার একরের বেশি সরকারি খাস পাহাড় কেটে সেখানে শত শত প্লট গড়ে তোলেন৷ এসব প্লট বিক্রি করে শতকোটি টাকার মালিক বনে যান ইয়াছিন। এতে পরিবেশ-প্রতিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়ে।
গত বছরের ৩০ আগস্টের পর থেকে জঙ্গল সলিমপুর (ছিন্নমূল) ও আলীনগর এলাকা দুটি নিয়ন্ত্রণ করছেন ইয়াছিন। পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্যসহ মাসিক ৩-৪ কোটি টাকার বাণিজ্য চলে সেখানে৷ চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনা করে র্যাবের একটি দল। এসময় সন্ত্রাসীদের হামলায় আব্দুল মোতালেব ভূঁইয়া নামে একজন র্যাব কর্মকর্তা নিহত হন৷ তিনি র্যাব-৭ এর উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনার তিন দিন পর ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে সীতাকুণ্ড থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়৷ তবে এরপর থেকে উল্লেখযোগ্য কোন আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি৷ এর আগে গত বছরের ৫ অক্টোবর জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘এখন’ এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হোসাইন আহমেদ জিহাদসহ তার সঙ্গে থাকা চ্যানেলটির ক্যামেরাম্যান৷
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

