চট্টগ্রাম নগরীতে গত দুয়েক বছর ধরে কোনোভাবেই থামছে না ‘টার্গেট কিলিং’। মাত্র ২০ মাসে অন্তত ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুন হওয়ার আগে ভুক্তভোগীরা হুমকি পেয়েছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে জানাজানিও হয়েছিল। এমনকি থানায় জিডিও করা হয়েছিল। তবু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো ধরনের আগাম ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
সবশেষ গত বৃহস্পতিবার নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় বোনের বাসায় বেড়াতে এসে দুর্বৃত্তের গুলিতে হাসান রাজু (২৪) নামে এক যুবক নিহত হন। ঘটনার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেশমি আক্তার নামে ১২ বছরের এক শিশুর চোখে গুলিবিদ্ধ হয়।
নিহত রাজু নিজেও আরেকটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। রাজুর পরিবার জানায়, রাউজানে একটি পক্ষের সঙ্গে রাজুর বিরোধ ছিল। তারা জানতেন রাজুকে কেউ খুঁজছে। রাজু নিজেও আতঙ্কে ছিলেন। কিন্তু থানায় গিয়ে কী লাভ হবে—এমন সংশয়েই দিন কেটেছে। পরে বৃহস্পতিবার রাতে মাস্ক পরা অস্ত্রধারীরা রাজুকে তাড়া করে মাথায় গুলি করল। এরপর তারা নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল।
রাজুর বোন রুমা আক্তার বলেন, আগে জানলে থানায় যেতাম। কিন্তু থানায় গেলে কী হতো? একটি কাগজ পেতাম, আর কিছু না।
এ অভিযোগ শুধু রুমা আক্তারের নয়। চট্টগ্রামে গত দুই বছরে যতগুলো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই একটি প্যাটার্ন স্পষ্ট। হত্যার আগে হুমকি, তারপর অভিযোগ। পুলিশের নীরবতা, তারপর হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি খুনের পর পুলিশের একই বাক্য ‘তদন্ত চলছে’।
জিডি হলেও ব্যবস্থা নেয় না পুলিশ
চট্টগ্রামের পটিয়ায় ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর একটি খামারে ডাকাতি হওয়ার পর মালিক থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর একই খামারে আবার ডাকাতি হয়।
হত্যা মামলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। ২০২৫ সালের ২৩ মে চট্টগ্রামের ‘সন্ত্রাসী’ আলী আকবর ওরফে ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বায়েজিদ থানায় একাধিক জিডি করেছিলেন তিনি।
নিহত আকবরের স্ত্রী রূপালী বেগম বলেন, সে সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাকে বাঁচতে দিল না। আমরা এখনো তার খুনিদের বিচার পেলাম না।
এরপর গত বছরের ৩ নভেম্বর বায়েজিদের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির গণসংযোগে হত্যা করা হয় আরেক সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে। তিনিও বায়েজিদ, চাঁন্দগাওসহ কয়েকটি থানায় জিডি করেছিলেন। এমনকি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজকেও হুমকির বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে জানায় সরোয়ার বাবলার পরিবার ।
চট্টগ্রামের একাধিক আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হুমকি পেয়ে জিডি করলে ওই জিডি সাধারণত ফাইলবন্দি হয়। কোনো তদন্ত হয় না, কোনো সতর্কতামূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয় না। হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলে ওই জিডিই পরে ‘প্রমাণ’ হিসেবে ব্যবহার হয়। কিন্তু তখন আর কিছু করার থাকে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইনজীবী বলেন, জিডি নেওয়ার পর পুলিশ একটি নাম্বার দেয়, ফাইলে রাখে। হুমকিদাতাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে না, নজরদারি করে না, আগাম গ্রেপ্তারও করে না। এ সিস্টেম দিয়ে টার্গেট কিলিং ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ বলেন, জিডি করা হলে আমরা যে নিরাপত্তা দিই না, তা অনেকাংশে ঠিক নয়। আমরা জিডি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নিই।
শুধু রাউজানেই ১৭ খুন
নগরীর রাউজান উপজেলায় গত দুই বছরের কম সময়ে অন্তত ১৭ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ জন রাজনৈতিক বিরোধের কারণে খুন হয়েছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে। প্রতিটি খুনের আগে এলাকায় উত্তেজনা ছিল, পক্ষে-বিপক্ষে দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু পুলিশ আগে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে রাউজানে সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড ক্রমেই বেড়ে চলছে। তারপরও প্রতিরোধমূলক কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি।
বিএনপিকর্মী আবদুল হাকিম খুন হওয়ার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডে দুটি সন্ত্রাসী দল অংশ নিয়েছিল এবং টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা হয়েছিল। এ পরিকল্পনা রাতারাতি হয়নি। সংগঠিত হতে সময় লেগেছে। ওই সময় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কোথায় ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর নেই কেন—বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন এখন একটাই—শীর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান কোথায়? তবে রায়হান আমার দেশকে বলেছিলেন, রাউজানে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘ডাকাত আলম’ নামে একজনের হাত রয়েছে, যিনি আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার ২০ সদস্যের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তার নাম জড়াচ্ছে। তবে আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বায়েজিদ থানার চালিতাতলীর বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, এ দুটি গ্রুপ গত দুয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম শহর ও জেলার রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে ।
প্রকাশ্যে খুনের মূল আসামিও পলাতক
চট্টগ্রামে পরপর তিনদিন প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি ও খুনের ঘটনার মূল আসামিদের কেউ ধরা পড়েনি। সন্ত্রাসীরা সক্রিয় থাকলেও পুলিশ ঘটনা রোধে আগাম কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কাজে আসছে না গোয়েন্দা নজরদারি।
গত বছরের নভেম্বরে চালিতাতলীতে বিএনপির গণসংযোগের সময় প্রকাশ্যে গুলি করে সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়। হত্যাকারীকে ক্যামেরায় দেখা যায়। তবু মূল আসামি ধরা পড়েনি।
একই থানায় গত বৃহস্পতিবার রাতে হাসান রাজু খুনের শিকার হন। মাস্ক পরা সন্ত্রাসীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় কেউ এগিয়ে আসতে সাহস করেননি। রাজুকে গুলি করে অস্ত্রধারীরা দ্রুত চলে যায়। পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায়। তদন্ত শুরু হলেও আসামি আর মেলে না।
জানতে চাইলে নগর পুলিশের উপকমিশনার আমিনুর ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি নয়; বরং উন্নতি হচ্ছে। হাসান রাজুর ঘটনার বিরোধ রাউজানে। তবে যারা জড়িত, তাদের আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। অভিযান অব্যাহত আছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে টিকে থাকছে সন্ত্রাসীরা
নগরীর হালিশহরে ২০২৫ সালের আগস্টে ওয়াহিদুল হক হত্যাকাণ্ডের পর দেখা যায়, তিনি আগে আওয়ামী লীগের এক কাউন্সিলরের অনুসারী ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি যুবদলের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন।
পুলিশ বলছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৬৪ জন ‘বড় ভাই’ কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন । পুলিশ নিজেই এটা জানে। কিন্তু ওই ৬৪ জনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে তথ্য পাওয়া যায় না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রকাশ। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে কারো পক্ষে এলাকাজুড়ে একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের সিস্টেমে প্রিভেনটিভ পুলিশিং বলে কিছু নেই। আমরা শুধু লাশ পড়লে নড়ি। এটা বদলাতে না পারলে কোনো অভিযানই কাজে আসবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের সমস্যা শুধু পুলিশের দক্ষতার নয়, ইচ্ছাশক্তির। যতদিন সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক ছাদ থাকবে, ততদিন গ্রেপ্তার হবে না। পুলিশ জানে কোথায় হাত দিলে কোন নেতার পা ভেজে।
তিনি আরো বলেন, এই মুহূর্তে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। প্রথমত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বিশেষ অভিযান। শুধু স্থানীয় পুলিশের ওপর নির্ভর নয়, র্যাব ও গোয়েন্দা বিভাগের সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জরুরি ভিত্তিতে এবং নিয়মিতভাবে করত হবে। দুই কিশোর গ্যাং গ্রুপই আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র রামদা ও কিরিচ নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়েছে। এ অস্ত্রের উৎস খুঁজে বন্ধ না করলে কিলিং থামবে না।
তৃতীয়ত, হুমকির জিডি পেলে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বাধ্যবাধকতা। এটি নীতিমালায় থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ হয় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

