চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নে সমুদ্র উপকূল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের কার্যক্রম অবশেষে বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এরআগে, দৈনিক আমার দেশে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ‘সীতাকুণ্ডে সাগর থেকে বালু তুলে শতশত একর আবাদি জমি ভরাট’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ প্রকাশের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন সরেজমিনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। তিনি সমুদ্র উপকূল থেকে বালু উত্তোলন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে কৃষিজমিতে বালু ভরাটের সব কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আমার দেশ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে সরেজমিনে গিয়ে বালু উত্তোলন ও জমি ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। খাস জমি যথাযথ বন্দোবস্ত ছাড়া ভরাটের কোনো সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি পরিবর্তন, খাস জমির পরিমাণ এবং নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আবারো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন কচি এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন এ অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানে ৯টি ড্রেজার জব্দ করা হয় এবং বাল্ক হেডের ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের খবর পেয়ে অনেকেই পালিয়ে যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ উপকূলের নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলনের সীমিত অনুমতি দিলেও সাগরের ভেতর থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি নেই। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্দরের দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, মুরাদপুর ও সৈয়দপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছিল। বিশেষ করে গত এক মাস ধরে বড় পাইপলাইনের মাধ্যমে সাগর থেকে বালু তুলে দুই ও তিন ফসলি উর্বর জমি ভরাট করা হচ্ছিল।
সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর সমুদ্র উপকূল, বাঁশবাড়িয়া নড়ালিয়া সড়কের শেষ প্রান্তের সাগর তীর, কুমিরা ইউনিয়নের আকিলপুর ও আলেকদিয়া ব্রিজ সংলগ্ন দক্ষিণ পাশ, বাড়বকুণ্ড সী বীচ, মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী সি বিচ, হাসনাবাদ ও ভাটের খীল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এ কার্যক্রম চলছিল।
সৈয়দপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জলদাস পাড়ার বাসিন্দা মৃদুল চন্দ্র দাস আমার দেশকে বলেন, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুর থেকে সৈয়দপুর ইউনিয়নের বগাচতর পর্যন্ত শতাধিক ড্রেজার দিন-রাত সাগর থেকে বালু উত্তোলন করছে। এতে জেলেরা স্বাভাবিকভাবে মাছ আহরণ করতে পারছেনা। শতাধিক মাছ ধরার জাল ছিঁড়ে ফেলেছে। ফলে অনেক জেলে সাময়িকভাবে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন এবং আর্থিক সংকটে পড়েন। প্রতিকার চেয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরের স্মারকলিপি দিয়েছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৪৬ দশমিক ৮৮ একর জমির শ্রেণি কৃষি থেকে শিল্পে পরিবর্তন করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুই ও তিন ফসলি জমির নাল থেকে শিল্পে শ্রেণি পরিবর্তন করেছে। ওই শিল্প শ্রেণির জমিকে ভিত্তি দেখিয়ে আশপাশের আরও কয়েকশ একর আবাদি জমি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভরাট হওয়া অংশের মধ্যে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ একর সরকারি খাস জমিও রয়েছে, যার কোনো বৈধ বন্দোবস্ত নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর কারখানার নামে কৃষিজমি ভরাট করছেন। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোন করলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি এই কারণে তার বক্তব্যে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে শুধু কৃষিজমিই নয়, উপকূলীয় পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদও হুমকির মুখে পড়েছিল। কৃষকদের আশঙ্কা, উর্বর জমি ভরাট হয়ে গেলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং স্থানীয় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং শত শত কৃষক বেকার হয়ে পড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

