রাজশাহী-১ আসনের ভোটারদের ক্ষোভ এখন চরমে। সীমান্ত ঘেঁষা গোদাগাড়ী ও তার পাশের তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী-১ আসনের ভোটারদের প্রধান দাবি এখন একটাই মাদক ও পানিসংকটের স্থায়ী সমাধান।
গোদাগাড়ী সীমাস্ত দিয়ে প্রতিদিনই আসছে হেরোইন। এই অবৈধ কারবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছে এলাকার গডফাদাররা। কিন্তু তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ অভাব কিংবা লোভে পড়ে হেরোইন বহন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে একের পর এক পরিবার।
একই সঙ্গে বরেন্দ্র অঞ্চলের এই জনপদকে নীরবে গ্রাস করছে আরেকটি ভয়াবহ সংকট ভূ-গর্ভস্থ পানির ঘাটতি। পানির অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে কৃষি।
গোদাগাড়ী ও তানোর দুই উপজেলাতেই সেচ সংকট প্রকট হলেও মাদকের আগ্রাসন সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে গোদাগাড়ীতে। প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা এই দুটি সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও ভোট শেষ হলে আশ্বাসগুলো মিলিয়ে যায়। দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয় না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও একই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
চার লাখ ৬৮ হাজার ৩৬২ জন ভোটারের এই আসনে এবার চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে ভোটের মাঠে আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে ঘিরে।
মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক সামরিক উপদেষ্টা। অন্যদিকে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির। তিনি ১৯৮৬ সালে একবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন শরীফ উদ্দীনের বড় ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছর এই আসনটি আওয়ামী লীগের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর দখলে ছিল। তার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ বহুদিনের। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে।
গোদাগাড়ী পৌরসভার বারুইপাড়া মহল্লার বাসিন্দা আসগার আলী বলেন, এই সীমান্ত দিয়ে যে পরিমাণ হেরোইন ভারত থেকে দেশে ঢোকে, তা অন্য কোনো সীমান্ত দিয়ে আসে না। তিনি বলেন, এর সামান্য অংশই ধরা পড়ে। ধরা পড়ে মূলত গরিব বহনকারীরা। গডফাদাররা নিজের হাতে এসব ছুঁয়েও দেখে না। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে মামলার তদন্তে ও নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। ফলে আইনের হাত তাদের ছুঁতে পারে না। স্থানীয় সরকারের অনেক জনপ্রতিনিধিও এই কারবারের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোদাগাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি আইনজীবী শ্রী শান্ত কুমার মজুমদার আরও ভয়াবহ অভিযোগ তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা মাদক জব্দের পর দালালের মাধ্যমে তা আবার বাজারে বিক্রি করে দেয়। আদালতে জমা দেওয়া হয় মাদকসদৃশ পাউডার। ফলে মাদক কমে না। রাজনৈতিক নেতারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েই নির্বাচন করেন। এ কারণেই মুখের বক্তব্য আর বাস্ততার মধ্যে বিস্তর ফারাক থেকে যায়।
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, শুধু বহনকারীদের ধরে কোনো দিন মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। নির্বাচিত হলে সেই ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তিনি নির্বাচিত হলে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
মাদকের পাশাপাশি গোদাগাড়ী-তানোরের সাধারণ মানুষের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা সেচের পানি। এই অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থাপনা করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নলকূপ অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে সেচ প্রদানে ব্যাপক পক্ষপাতিত্ব হয়। সাধারণ কৃষকেরা পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হন।
এই স্বজনপ্রীতির নির্মম চিত্র উঠে আসে ২০২২ সালের মার্চে। বোরো মৌসুমে পানি না পেয়ে গোদাগাড়ীর নিমঘটু গ্রামের দুই আদিবাসী চাচাত ভাই বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। বছরের পর বছর নির্বিচারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এই এলাকায় পানির স্তর ভয়াবহভাবে নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও পানির স্তর ১৩০ থেকে ১৮০ ফুট বা তারও বেশি গভীরে চলে যাওয়ায় বহু নলকূপে আর পানি উঠছে না।
এই প্রেক্ষাপটে গত বছর বিএমডিএ একটি গভীর নলকূপের আওতায় ধান চাষের জমির পরিধি নির্ধারণ করে দেয় এবং ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। সে সময় বিএমডিএর চেয়ারম্যান ছিলেন বিএনপির প্রার্থী শরীফ উদ্দীনের ভাই ড. এম আসাদুজ্জামান। তবে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই তিনি গত বছরের ২৩ মে মারা যান।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর এলাকার কৃষক মইদুল ইসলাম বলেন, মাটির নিচে এখন আর পানি নেই। কৃষিকাজের জন্য পানি পাওয়া যাচ্ছে না। খাওয়ার পানির জন্যও সাব-মার্সিবল পাম্প বসাতে হচ্ছে। হাতে চাপা কল দিয়ে কোনো পানি উঠে না। ভোটের আগে সবাই আশ্বাস দেয়, কিন্তু ভোট শেষে কেউ আর ফিরে তাকায় না।
সম্প্রতি সরকার একটি গেজেট প্রকাশ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তানোরের মুন্ডুমালার কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে বলেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু পানি না তুললে চাষাবাদ কীভাবে হবে, মানুষ কীভাবে বাঁচবে এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না। যিনি এমপি হবেন, তার কাছেই কৃষকদের একটাই দাবিস্তব সম্মত সমাধান।
রাজশাহী জেলা আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ড. মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে অপারেটর নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণেই অনেক জায়গায় দুই মাস ধরে গভীর নলকূপ তালাবদ্ধ থাকে। তারা সরকার গঠন করলে এমন পরিস্থিতি আর থাকবে না বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে জামায়াতের সংসদ সদস্যই প্রথম সৌদি আরব থেকে ৯ কোটি টাকা অনুদান এনে বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করেছিলেন।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, তার ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক বরেন্দ্র প্রল্পের মাধ্যমে এলাকায় রাস্তঘাট নির্মাণ ও বনায়ন করেছেন। আরেক ভাই ড. এম আসাদুজ্জামান পানি সংকট নিরসনে কাজ করেছেন এবং বিএমডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে কৃষকের কোনো সমস্যা থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচিত হলে ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করে সেচ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান করা হবে এমন আশ্বাস দেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

