চট্টগ্রাম–৮ আসনে ১০ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ালেও তার স্থানীয় সমর্থকরা যেন এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না। প্রতিদিনই পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও বোয়ালখালীর বিভিন্ন মহল্লায় দেখা যাচ্ছে তাদের গণসংযোগ, লিফলেট বিলি আর নীরব প্রচারণা-সবই আবু নাসেরের পক্ষেই।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন ডা. আবু নাসের। এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ, বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ।
গত ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের মাত্র দুই ঘণ্টা পর ডা. আবু নাসের আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। জোটের সিদ্ধান্তকে ‘সম্মান’ জানিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু তৃণমূল যেন এ ঘোষণা শুনতেই চায় না। শনিবারও চান্দগাঁওয় ও বোয়ালখালীতে এলাকায় কর্মী সমাবেশে দেখা যায়, স্থানীয় জামায়াত সমর্থকরা এখনো বাড়ি–বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন ‘ডাক্তার ভাইয়ের’ নামে।
রাশেদুল হাসান নামে এক কর্মী বলেন, এটা কেন্দ্রের ভুল সিদ্ধান্ত। নাসের ভাই ছাড়া এ আসনে জোটের আর কাউকে ভোট দেবে না মানুষ। পাঁচলাইশের আরেক কর্মী এহছানুল হক বলেন, দেড় বছর ধরে মাটি কামড়ে কাজ করেছে নাসের ভাই। এ এলাকায় তার সামাজিক প্রভাব আলাদা। হঠাৎ কেউ এসে জনগণের মন জিততে পারবে না।
জানতে চাইলে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসের বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তই বড় সিদ্ধান্ত। দল আমাকে প্রত্যাহার করতে বলেছে, আমি সেটাই করেছি। দলের বাইরে গিয়ে কোনো অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে অনেক ভোটার আমাকে চাইতে পারেন, এটা তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি। আমি তো কারও মুখ বন্ধ করে দিতে পারব না। তারা যাকে ভালো মনে করেন, তাকে নিয়েই কথা বলবেন। অনেকে এই আসন ওপেন চাচ্ছেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, আমি মাঠে নেই, কোনো প্রচারণায়ও নেই। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু করার প্রশ্ন ওঠে না।
লোকাল জনপ্রিয়তা বনাম কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত
চট্টগ্রাম–৮ আসনে জামায়াত বহু বছর ধরে একটি স্থায়ী ও সংগঠিত ভোটব্যাংক ধরে রেখেছে। মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, রমজানের ইফতার বিতরণ, ত্রাণ কর্মকাণ্ড-সব মিলিয়ে ডা. আবু নাসের ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ। স্থানীয়রা বলছেন, তিনি প্রতিদিন এলাকায় ছিলেন, মানুষ তার কাছে যেত। তিনি কাজ করতেন। এনসিপির প্রার্থীর তো এখানে আগের কোনো কাজই নেই।
তৃণমূলে তাই এখন একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব! স্থানীয় জনপ্রিয়তা নাকি কেন্দ্রীয় ‘জোট–রাজনীতি’? চান্দগাঁও বোয়ালখালীর অংশের আবুল ফজর নামে এক ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, কেন্দ্র তো অনেক হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু ভোটটা দেয় এলাকার মানুষ। এলাকায় যাকে মানুষ চেনে না, তাকে ভোট কিভাবে দেবে?
জোটের প্রার্থী হলেও এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ নিয়ে মাঠে যেন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। পাঁচলাইশের আবু বকর নামে মধ্যবয়সী ভোটার বলেন, লোকটাকে আগে কখনো দেখিনি। ভোট চাইতে এসেছে কদিন হলো। জোটের কারণে ধাক্কা দিয়ে আনা হয়েছে-এমনটাই মনে হচ্ছে।
চান্দগাঁওয়ে নানুয়ার দিঘীর পাড় এলাকায় নির্বাচন অফিস খোলার পরও সেখানে কর্মী সমাগম ছিল খুবই কম। স্থানীয়রা বলছেন, তিনি মূলত চট্টগ্রাম–১৩ আসনে কাজ করছিলেন। এখানে ভোটারদের সঙ্গে তার পরিচয় নেই।
এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মীর সংখ্যাও সীমিত। ফলে বড় ধরনের গণসংযোগ বা সংগঠিত প্রচারণায় গতি নেই।
জোটের ব্যানারে গণসংযোগ চালালেও এলাকাবাসীর মাঝে উল্লেখযোগ্য সাড়া সৃষ্টি করতে পারেননি তিনি।
জোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কেন্দ্রে চাপ থাকলেও মাঠে কর্মীরা উল্টোদিকেই চাপ দিচ্ছেন। একজন জেলা পর্যায়ের জোটনেতা বলেন, কেন্দ্রীয় সমীকরণে এনসিপিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠে দেখা যাচ্ছে উল্টো প্রতিক্রিয়া। কর্মীরা আবু নাসেরকে ছাড়তে চাইছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি নির্বাচন ও জোট পরিস্থিতি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি লেখেন, দশ দলীয় জোটের পারস্পরিক অসহযোগিতা দিনশেষে বিএনপি বলয়কে পুরো দেশে আরও শক্তিশালী করবে। এই সরল সত্যটুকু দশ দলের সবারই বুঝতে হবে। নয়তো পরাজয় অবধারিত।
আরিফ আরও লেখেন, এনসিপি নেতাকর্মীরা বাংলাদেশের সব এলাকায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। জয় নিশ্চিত করা লাগবে আমাদের। খোদা তায়া’লা আমাদের বোঝার তাওফিক দান করুন আমিন। তার এ স্ট্যাটাসটি প্রকাশের পর জোটের ভেতরের টানাপোড়েন, মাঠপর্যায়ের অসহযোগিতা ও প্রার্থী-সমর্থকের বিভক্ত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, জোটের ঐক্যহীনতা মাঠপর্যায়ের ভোটে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক (নাম প্রকাশ করেনি) বলেন, জোটের সিদ্ধান্ত সব সময় মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলবে না-এটাই বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতির বাস্তব চিত্র। চট্টগ্রাম–৮ আসনে জামায়াত যে ডা. আবু নাসেরকে ছাড়তে পারছে না, তা মূলত স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক আস্থার প্রতিফলন। এনসিপির প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেওয়ার পরও কর্মীরা যখন আগের নেতৃত্বের পক্ষেই প্রচারণা চালাচ্ছেন, তখন বোঝা যায় কেন্দ্রীয় সমীকরণ স্থানীয় রাজনৈতিক মানচিত্রে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের নেতৃত্ব মনে করছে জোটের স্বার্থে প্রার্থিতা প্রত্যাহার ঠিক হয়েছে, কিন্তু মাঠে যারা কাজ করেন তারা দৃশ্যমান শক্তি, জনপ্রিয়তা ও ভোটের বাস্তব অঙ্ক দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তাই তাদের কাছে ডা. আবু নাসেরই ‘যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছিলেন। এনসিপির প্রার্থীর জনসমর্থনের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

