চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে রোববার দিবাগত রাতে র্যাব ও পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পে একযোগে হামলা ও গুলিবর্ষণ করেছে সন্ত্রাসীরা। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ সশস্ত্র সন্ত্রাসীর হামলার ঘটনায় গোয়েন্দাদের কাছে কী তথ্য ছিল এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে ।
ইয়াসিন বাহিনী এ হামলা চালিয়েছে বলে মনে করছে র্যাব। হামলার পর র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে।
হামলার চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠে আসছে অন্য জায়গা থেকে। রাতভর পাহাড়ি এলাকায় অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চার ফুট গভীর করে রাস্তা কাটা হলো, এস্কেভেটর চলল ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তিনদিক থেকে সমন্বিত হামলা চলল, তারপর হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেল-এই পুরো আয়োজন কি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে পড়েনি? নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এটিকে বলছেন গভীর গোয়েন্দা ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, রাত ১টার পর জঙ্গল সলিমপুরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত র্যাব ক্যাম্প লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে। এই হামলার জন্য তিনি ইয়াসিন বাহিনীকে দায়ী করেছেন। হামলাকারীরা শুধু র্যাব ক্যাম্পেই হামলা করে থামেনি একই সময়ে কাছের পুলিশ ক্যাম্পেও হামলা চালায়। দুটি ক্যাম্পে একই সময়ে সমন্বিত আক্রমণ স্পষ্টতই বড় পরিকল্পনার অংশ।
হামলার আগে রাতভর এস্কেভেটর দিয়ে পাঁচটি স্থানে রাস্তা কেটে ফেলা হয়। উদ্দেশ্য একটাই-যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্যকারী গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে। হামলার পর নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সুবিধা হয়, সেই বিকল্প পথও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত।
সরকারি খাসজমিতে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার পাশাপাশি পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকান ও মার্কেট। সরকার ইতোমধ্যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কারাগার, আইটি পার্ক নির্মাণসহ ১১টি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বেহাত হওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে না পারায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটেই ওই এলাকায় র্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। সেই ক্যাম্পকেই এবার লক্ষ্য বানাল সন্ত্রাসীরা।
গোয়েন্দা ব্যর্থতার তিন স্তর
ঘটনার প্রায় ১৪ ঘণ্টা পরও কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, সোমবার শেষ খবর বিকেল ৪টা পর্যন্ত ধরা পড়েনি কোনো নেতা বা সদস্য। ফলে হামলাকারীদের সংগঠন, সংখ্যা ও গতিপথ-সবই এখনো অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যর্থতা দেখা গেছে তিনটি স্তরে।
প্রথমত, প্রাক-ঘটনা ব্যর্থতা। রাস্তা কাটার মতো বড় কর্মকাণ্ড নজর এড়িয়েছে, এলাকায় অচেনা মানুষের বিচরণ ধরা পড়েনি, পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী যন্ত্র চললেও কেউ তা শনাক্ত করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, ঘটনার সময়ের ব্যর্থতা। ক্যাম্পে হামলা শুরু হওয়ার আগেই সতর্কবার্তা আসেনি। যোগাযোগব্যবস্থায় দ্রুত সমন্বয় হয়নি এবং রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, ঘটনার পরেও ব্যর্থতা। হামলাকারীদের পালানোর পথ শনাক্ত করা যায়নি, অস্ত্র উদ্ধার হয়নি এবং সম্ভাব্য নেতৃত্ব বা সংগঠনের চিহ্ন এখনো মিলছে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
দীর্ঘদিন পুলিশের ডিবিতে কাজ করা উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার এক সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, রাতভর এস্কেভেটর দিয়ে পাঁচ স্থানে রাস্তা কেটে ফেলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংকটের দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত। এ ধরনের কার্যক্রম বহু মানুষের চোখের সামনে ঘটে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ, সমর্থন অথবা নীরব প্রশ্রয় ছাড়া এমন আয়োজন সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই নড়াচড়ার আভাস পেল না কেন? বলেন তিনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। রাস্তা কাটা মানে পরিকল্পনা, সময়, এবং বড় দলবলের কাজ। গোয়েন্দা নজরদারি থাকলে এ ধরনের প্রস্তুতি নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। এটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যালার্টনেসের ঘাটতি। তিনি আরো যোগ করেন, বাইপাস তৈরি, ভেতরে ফাঁদ পাতা ও বের হওয়ার পথ নিশ্চিত করা—এগুলো সবই গেরিলা কৌশলের অংশ। এর একটিও ধরা না পড়া উদ্বেগজনক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া নয়-এটা সংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ফল। এ ধরনের ত্রিমুখী আক্রমণের জন্য আগে থেকেই মানচিত্র, পথচিহ্ন, নজরদারি ও যোগাযোগব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হয়।
'রাত দুইটায় পাহাড় কাটার শব্দ শুনেছিলাম'
স্থানীয় বাসিন্দা রাবেহা বেগম বলেন, আমরা রাত দুইটার দিকে শব্দ শুনেছি। মনে হয়েছিল পাহাড় কাটছে কেউ। কে করবে, কেন করবে এটা তো র্যাব-পুলিশের জানা থাকার কথা। এত বড় এলাকা জুড়ে যন্ত্র চলল, কারও চোখে পড়ল না?
জঙ্গল সলিমপুরের কয়েকজন দোকানদার জানান, কয়েকদিন ধরেই কিছু অপরিচিত মানুষকে দেখা গেছে। রাতে মোটরসাইকেলও চলছিল। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন এসব কোনো নজরে পড়েনি?
হামলায় উপস্থিত এক পুলিশ সদস্য জানান, প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম বৃষ্টির শব্দ। পরে দেখি তিনদিক থেকে গুলি আসছে। হামলাকারীদের অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। তারা জায়গা বদলে গুলি করছিল।
শূন্য রিকভারি মানে গোয়েন্দা ঘাটতি
হামলায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার হলেও এখনো কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, দুই ক্যাম্পে দুই ঘণ্টা গুলি চলল-অন্তত কয়েকটি কার্তুজ, অস্ত্রের খোসা বা অস্ত্র লুকানোর চিহ্ন পাওয়ার কথা। কিছুই না পাওয়া মানে তাঁরা পালানোর পথ পুরোপুরি নিশ্চিত করেই এসেছিল। শূন্য রিকভারি মানে গোয়েন্দা ঘাটতি।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসীরা এর মাধ্যমে বার্তা দিচ্ছে—এখনো সলিমপুর তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে তাঁর মতে, শক্তিশালী অভিযান চালালে সন্ত্রাসীরা টিকতে পারবে না।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, হামলার আগে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পনা করে রাস্তা কেটে ফেলে। এতে আমাদের গাড়ি চলাচল ব্যাহত হয়েছে। তবে আমরা দ্রুত এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। তিনি স্বীকার করেন, পাহাড়ি এলাকায় নজরদারির সিস্টেম আরও শক্ত হতে হবে। কারা জড়িত, কীভাবে এত বড় প্রস্তুতি নিয়েছে—সবকিছুই আমরা খতিয়ে দেখছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় যেমন ভৌগোলিকভাবে জটিল, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল। এখানে আগাম তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং সংঘাত-সংবেদনশীল এলাকা সম্পর্কে সমন্বিত বিশ্লেষণ জরুরি। গোয়েন্দা প্রযুক্তি, নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য-শৃঙ্খলের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দূর না করলে ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকানো কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেছেন তাঁরা।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

