পাহাড়ের বুকচিরে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী, সবুজ পাহাড় আর মেঘ-রোদের খেলায় মোহময় বান্দরবানের চিরকালীন প্রকৃতি। সে নয়নাভিরাম পরিবেশের মধ্যেই নজর কাড়ছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত একটি ব্যতিক্রমী স্থাপনা। দূর থেকে দেখতে বিলাসবহুল রিসোর্ট বা আন্তর্জাতিক মানের স্থাপনার মতো মনে হলেও এটি আসলে বালাঘাটায় নির্মাণাধীন দেশের অন্যতম আধুনিক প্ল্যান্ট টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি, যা পাহাড়ি কৃষিতে খুলে দেবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
স্থাপত্যেই ভিন্নতা, ভাবনায় ভবিষ্যৎ
সাঙ্গু নদীর পাশ ঘেঁষে নির্মাণাধীন গোলাকার ভবনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নকশা। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিউক্লিয়াস বা কোষকেন্দ্রের আদলে তৈরি করা হয়েছে পুরো স্থাপনাটি। আধুনিক স্থাপত্য আর পরিবেশবান্ধব ধারণার সমন্বয়ে নির্মিত ভবনটি যেন পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছে।
সিরামিক ব্রিক ও আয়রন চিপস ব্যবহার করে এমনভাবে ভবনটির বাইরের অংশ তৈরি করা হয়েছে যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে। ভবনের ভেতরে থাকছে আধুনিক মিডিয়া প্রস্তুতি রুম, ইনোকুলেশন বা ট্রান্সফার রুম, কালচার বা গ্রোথ রুম, অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ও হার্ডেনিং জোন, গ্লাস হাউস এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণের বিশেষায়িত সুবিধা। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামোই রাখা হচ্ছে এখানে।
পাহাড়ি কৃষিতে প্রযুক্তির নতুন দুয়ার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, টিস্যুকালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ রোগমুক্ত ও জেনেটিকভাবে অভিন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব। এতে উৎপাদন বাড়বে, রোগের ঝুঁকি কমবে এবং কৃষকের ব্যয়ও কমে আসবে।
রাজবিলা এলাকার কৃষক নিংসাথুই মারমা বলেন, আমরা অনেক সময় বাইরে থেকে চারা কিনে আনি, কিন্তু অনেক চারাই ঠিকমতো হয় না, রোগ হয়, গাছ মারা যায়। এ ল্যাব হলে পাহাড়ের কৃষকরা উন্নত ও রোগমুক্ত চারা পাবে।
তিনি জানান, পাহাড়ি বাংলা কলা, সবরি কলা, আনারস, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফল, অর্কিডসহ উচ্চমূল্যের ফসলের উন্নত চারা উৎপাদন হলে তরুণদের কৃষির প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
নারী কৃষকদের নতুন স্বপ্ন
এ প্রকল্প ঘিরে আশাবাদী পাহাড়ি নারীরাও। কারণ পার্বত্য অঞ্চলে কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিনের হলেও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে তাদের সম্পৃক্ততা এখনো সীমিত।
বান্দরবান সদর ইউপির নারী কৃষক নাগছবি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমরা পাহাড়ে অনেক সম্ভাবনাময় ফসল চাষ করতে চাই। কিন্তু উন্নত চারা সহজে পাওয়া যায় না। এ ল্যাব হলে নারীরাও নতুনভাবে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবেন।
শুধু চারা নয়, হবে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ কেন্দ্র শুধু টিস্যুকালচার চারা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এখানে পাহাড়ি উপযোগী ফসল নিয়ে গবেষণা, নতুন জাত সংরক্ষণ, মাতৃগাছ উন্নয়ন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও করা হবে।
বিশেষ করে অর্কিড, বিদেশি ফুল, উচ্চমূল্যের ফল, পাহাড়ি মসলা ও জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, এটাকে সাধারণ একটি ভবন হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। আমরা ভবিষ্যতের কৃষির জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও মানসম্পন্ন চারা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং গবেষণাকে মাঠমুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ সতর্কতা
বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ জানান, ভবনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। অত্যন্ত মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। তিনি বলেন, গবেষণাগারের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়গুলো মাথায় রেখেই প্রতিটি উপকরণ ব্যবহারের আগে পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে।
কৃষির নতুন রূপান্তরের প্রতীক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী ড. এমএ রহিম বলেন, টিস্যুকালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য, রোগমুক্ত ও মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব। বান্দরবানের এ ল্যাব ভবিষ্যতে দেশে উন্নত চারা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদের মতে, বাংলাদেশের কৃষি এখন নতুন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। টিস্যুকালচার প্রযুক্তি সে সুযোগ তৈরি করছে।
তার ভাষায়, পাহাড়ি অঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল, মসলা ও রপ্তানিযোগ্য ফসলের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নত চারা ও প্রযুক্তি সহায়তা পেলে এখানকার কৃষকরা জাতীয় অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে পারবেন।
সব মিলিয়ে, সাঙ্গুর তীরে গড়ে ওঠা এ আধুনিক টিস্যুকালচার ল্যাব কেবল একটি ভবন নয়, এটি পাহাড়ি কৃষির ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের নতুন প্রতীক। বাংলাদেশের কৃষি যখন আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে, তখন পাহাড়ের বুকের এ স্থাপনাই হয়তো হয়ে উঠবে আগামী দিনের কৃষি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

