দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শহরে, নিথর দেহ ফেরত পাঠাল সন্ত্রাসীরা

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে শহরে, নিথর দেহ ফেরত পাঠাল সন্ত্রাসীরা

সকালটা ছিল একদম সাধারণ দিনের মতোই। কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরখালীর বাড়ির সামনে তখনো রোদ পুরোপুরি ওঠেনি। সে সময়ই কলেজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয় আশফাক কবির সাজিদ (১৭)। বাবা আবুল হাশেম সিকদার ছেলেকে বলেছিলেন, ‘সাবধানে যাস বাবা। ভালো করে পড়াশোনা করিস।’ মা রুবিনা আকতার হাতে আর কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, ‘মানুষ হবি বাবা। আল্লাহ সহায় হোক।’ পরিবারের সঙ্গে সেটাই ছিল তার শেষ কথা বলা।

কে জানত, মাত্র আট ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিথর হয়ে পড়ে থাকবে সেই ছেলেটি? গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রামের বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে মারধরের পর একটি নির্মাণাধীন ভবনের আটতলা থেকে লিফটের গর্তে ফেলে হত্যা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পরিবার জানায়, বদরখালী থেকে চট্টগ্রাম শহর স্বপ্নের মতোই ছিল সাজিদের কাছে। আট মাস আগে যখন চট্টগ্রামের বিএএফ শাহীন কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলো, তখন থেকেই তার চোখে যেন নতুন আলো জ্বলে উঠেছিল। ব্যস্ত শহর, উঁচু ভবন, কলেজের ভিড়Ñসবকিছুই তাকে টানত। বন্ধুদের বলত, শহরে অনেক সুযোগ আছে, আমি কঠোর পরিশ্রম করব। তার বাবা-মাও বিশ্বাস করতেন, সাজিদ বড় হবে, মানুষ হবে। পরিবারের হাল ধরবে।

আশফাকরা ছিল দুই ভাই এক বোন। সাজিদ ২০২৫ সালে বদরখালী আল আজহার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। পরে চট্টগ্রাম শহরের বিএএফ শাহীন কলেজে ভর্তি হয়। শহরে বসবাসের মোট সময় তার মাত্র আট মাস।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত এ পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব শক্তিশালী ছিল না। বাবা সামান্য ব্যবসা করেন, আয় সীমিত। কিন্তু ছেলের পড়াশোনার স্বপ্নে কোনো কমতি রাখেননি। তাই শহরে থাকার জন্য অল্প ভাড়ায় জায়গা খুঁজে দেন। চট্টগ্রামের চকবাজার থানার ডিসি রোড এলাকার মৌসুমি আবাসিক ভবন। সেখানেই ছিল সাজিদের ব্যাচেলর বাসা। ছোট্ট একটি রুম, চৌকি, টেবিল আর কিছু বই।

বাড়ি থেকে ফিরছিল সাজিদ

১২ এপ্রিল শুক্রবার। সকালে পরিবারের সঙ্গে নাশতা করে বের হয় সাজিদ। চকরিয়া থেকে শহরে ফিরছিল পড়াশোনার জন্য। দুপুরের দিকে পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তার। বেলা ৩টার দিকে সে পৌঁছে যায় চট্টগ্রাম শহরে।

তার পরিকল্পনা ছিল মৌসুমি আবাসিকের ব্যাচেলর রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেবে। তারপর রাতের পড়া। কিন্তু সেই রুমে সে আর পৌঁছাতে পারল না। পথে বাকলিয়া এলাকায় কিছু কিশোর-যুবকের হাতে পড়ে যায় সে। পুলিশের ভাষ্যমতে, তাকে জোর করে আটকে রাখা হয়। প্রাণ বাঁচাতে সে দৌড়ে ঢোকে চকবাজারের মৌসুমি আবাসিক ভবনে। ভেতর থেকে দেয়াল ঠেলে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল সে ভয় আর আতঙ্কে, শেষ চেষ্টা হিসেবে।

কিন্তু তাও শেষরক্ষা হলো না। ভবনের দারোয়ানকে ভুল বোঝানো হয় চোর ঢুকেছে বলে। দারোয়ান গেট খুলে দিলে সেই যুবকরা ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আটতলা পর্যন্ত তাকে তাড়া করা হয়। ধরা পড়ে যায়। শুরু হয় এলোপাতাড়ি মারধর। তারপর হঠাৎ ধাক্কা। মুহূর্তেই নিচে লিফট শ্যাফটে পড়ে যায় সাজিদের শরীর।

আটতলা ভবনের নিচে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দেহ দেখে প্রথমে স্থানীয়রা ৯৯৯-এ কল দেয়। পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেলে যখন বাবা পৌঁছালেন, তখন রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। বাবা আবুল হাশেম সিকদারের চোখে তখন শুধু শূন্যতা, আমার ছেলেটা তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল… ওরা কেন আমার সাজিদকে মারল!

গ্রেপ্তার তিনজনই সন্ত্রাসী

আশফাক হত্যার ঘটনার দুদিন পর খুনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার মিশকাতুল কায়েস, এনায়েতুল্লাহ ও এনামুল হক এলাকার পরিচিত সন্ত্রাসীÑএমনটাই জানান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। পুলিশ জানায়, এনায়েতুল্লাহর বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ১২টি মামলা। বাকিরাও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় কিশোর গ্যাং ও দখলবাজ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে দাবি করছে পুলিশ।

চকবাজার থানার ওসি বাবুল আজাদ বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজন কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য। হত্যার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন