আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কক্সবাজারে নির্বাচনি জনসভায় ডা. শফিক

রাজার ছেলে রাজা হোক,এই রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয় জামায়াত

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

রাজার ছেলে রাজা হোক,এই রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয় জামায়াত

দেশের অন্যতম প্রধান ইসলামিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাজার ছেলে রাজা হোক, এই রাজনীতির আমরা বিরোধী। যার যোগ্যতা আছে সে-ই এদেশের সেবক হোক ওইটাই আমরা দেখতে চাই। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আমার একজন রিক্সাচালক শ্রমিক ভাইয়ের মেধাবী সন্তান আগামী দিনে বিকশিত হয়ে সে যেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। ওই রকম দেশটা গড়তে চাই।

সোমবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জামায়াতে ইসলামি কক্সবাজার জেলা শাখা আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাঠে (গোলচত্বর মাঠ) এই জনসভার আয়োজন করা হয়। এই জনসভায় জামায়াতে ইসলামির লাখো নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, অতীতের অনেক কিছু নিয়ে কিছু হয়তো আমরা করতে পারবো না, কিন্তু কিছু বিষয় আমরা ছাড়তে পারবো না। আমরা ছাড়তে পারবো না আবু সাঈদের হত্যাকারীকে, আমরা ছাড়তে পারবো না আবরার ফাহিমের যারা হত্যাকারী তাদের শাস্তি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য কোনো ছাড় নাই। তাদের সহযোদ্ধারা, শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি, তার হত্যাকারীদের জন্য কোনো মায়া নাই দয়া নাই ছাড় নাই। এদের সহযোদ্ধাদের বিচার তো হতে হবেই। এটা তো ন্যায্যতার দাবি। তবে কারো উপর অবিচার করা হবে না, ইনশাআল্লাহ। কোনো পাইকারি জরিমানা নাই। সব কিছুকে গুলাইয়ে ফেলার কোন কর্মসূচি আমাদের নাই। তারপরও আমরা কথা দিচ্ছি, মানুষ তো ভুল করতেই পারে। অনুতপ্ত হয়ে যদি তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, তারা তাদের কাজের জন্য লজ্জিত, অবশ্যই তাদের বিষয়টা ইতিবাচক ভাবে বিবেচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, এবারের নির্বাচন হবে জাতির দিক পরিবর্তনের নির্বাচন, জুলাই বীরদের প্রত্যাশা পূরণের নির্বাচন, এই নির্বাচন হচ্ছে মা-বোনদের জন্য একটা নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন, এই নির্বাচন শিশুর স্বপ্ন মেলে ধরার নির্বাচন, এই নির্বাচন হচ্ছে পঁচা-ঘুণে ধরা ৫৪ বছরের যে রাজনীতি দফায় দফায় ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে সেই রাজনীতিকে বিদায় জানানোর, লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন।

তিনি মনে করেন, আগামী ১৩ তারিখ (ফেব্রুয়ারি) থেকে নতুন একটা বাংলাদেশ জনগণ পাবে। সেদিন আমাদের মায়েদেরকে মাথার উপর তুলে মর্যাদা দেবো, ইনশাআল্লাহ। তাদেরকে ঘরে চলাচলে কর্মস্থলে সব জায়গায় তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সেই জন্য আমরা বলেছি, মেয়েদের মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষা খরচ বহন করবে সরকার। বলবেন, মায়েদের জন্য করলেন, এটা বৈষম্য হয়ে গেলো না! তারা তো স্লোগান দিয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আমাদের কিছু বললেন না। না, বললাম না এই কারণে, এটা বৈষম্য নয়। এটা তাদের পাওনা, এটা তাদেরকে দিতে হবে।

জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা জনগণের প্রশ্ন নিজেই তুলে বলেন, বুঝলাম না, এটা কিভাবে পাওনা হয়! আচ্ছা, এই যে এতো বড় সমাবেশ, এখানে লাখো পুরুষ এসেছেন, আপনারা জীবনে কাউকে, কোন পুরুষকে তার পেটে বাচ্চা ধারণ করতে দেখেছেন? আপনারা কেউ নিয়েছেন? বুকের দুধ দিতে পারবেন? পারবেন না? এই নেয়ামত আল্লাহ মায়েদেরকে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, এই মাদেরকে যে জাতি সম্মান করবে সে জাতিকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন, ইনশাআল্লাহ। আর এই মাদেরকে যারা সম্মান করতে জানবে না তারা আল্লাহর কাছ থেকে কোন সম্মান পাবে না।

তিনি বিএনপির প্রতিশ্রুত বেকার ভাতা প্রসঙ্গ তুলে বলেন, জুলাই যোদ্ধারা রাস্তায় নেমে বলে নাই, আমাদের বেকার ভাতা দেন। তারা বলেছেন- আমাদেরকে কাজ দেন। আমার পাওনা কাজটা আমার হাতে তুলে দেন। মামু-খালুর টেলিফোনে আর কোটায় আমার নিজের মেধা যেন হারিয়ে না যায়। এই ছিল তাদের দাবি। আমার যোগ্যতায় আমার যে প্রাপ্য তা আমার হাতে দেন।

ডা. শফিক বলেন, আমরা যুবকদেরকে বলছি পরিষ্কার, একদম সাফ, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাড়া তুলে দিয়ে তাদের অপমানিত করবো না। আমাদের তাদের প্রত্যেকটা হাতকে মজবুত ভাবে গড়ে দেবো, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে। তারপর কাজ তুলে দিয়ে বলবো- এবার আগাও। এ দেশ তোমার। এবার চিৎকার দিয়ে বলো- আমিই বাংলাদেশ। সেই দেশের গর্বিত নাগরিক বানাতে চাই যুব সমাজকে।

তিনি সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, তারা বিভিন্ন ধরণের অনেক কিছু রটায়, ঘটায়। কারা করে এগুলা! যখন দেখে চর্থুরদিকে অন্ধকার, তখন দিনকেও রাত মনে করে। দিশেহারা হয়ে যায়, কী বলবে, কী বলবে, হিসাব খুঁজে পায় না। কিন্তু মনে রাখবেন- এ দিয়ে মানুষের ভালোবাসার জোয়ার ঠেকানো যাবে না। জনগণের দেহের উপর চাবুক মারতে পারবেন, মনের উপর চাবুক মারতে পারবেন না।

তাঁর ভাষ্যমতে, গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশে অনেক গুলো ঘটনা ঘটেছে, মা-বোনদেরকে অপমান করার। তার প্রতিবাদ আমি করি, এবং আমার পেছনে লেগেছে। ডাকাতের মতো, চোরের মতো লেগেছে। সামনে থেকে মোকাবেলা করার সাহস না পেয়ে এখন পেছন থেকে আমার পিছে লেগেছে। পেছনের লোকেরা পেছনে পড়ে থাকবে, সামনে যেতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। ওরা পেছন থেকে জাবর কাটতে পারবে, সিংহ পুরুষের মতো সামনে যাওয়ার সাহস ওদের নাই।

তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আহ্বান জানাই, আসুন- নিজের আদর্শ, কর্মসূচি, পরিকল্পনা, বক্তব্য চরিত্রে নিয়ে আসুন। বলবা, আমাদের সরকারই পারবে একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ দিতে। অবশ্য এভাবে কেউ বলে নাই। অনেকেই বলেছেন টুটি চেপে ধরতে।

তিনি বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, বগলের তলে ঋণখেলাপি, আর আপনি দেবেন বাংলাদেশ দুর্নীতি মুক্ত করে! পেঁচায়ও হাসবে এ কথা শুনে।

তাঁর ভাষায়, জনগণ চালাকি সবার বুঝে। জনগণকে কেউ যেন বোকা না ভাবে।

তিনি আমলাদের উদ্দেশ্যে বলেন, এখন রটাচ্ছে- কোন আমলে কোন কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, ১১ দল যদি ক্ষমতায় আসে জামায়াতের নেতৃত্বে এদের সবাইকে বাদ দিয়ে দেবে!

তিনি বলেন, আমাদের অঙ্গীকার, ইনসাফ কায়েম করা। যেদিন থেকে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে, সেদিন থেকে বাংলাদেশকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে, ইনশাআল্লাহ।

তিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা পেছনের দিকে তাকাবো না, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। সেদিন থেকে আমরা সবার মাঝে সততা আশা করবো, স্বচ্ছতা আশা করবো, দায়িত্বশীলতা আশা করবো। আমরা চাই না, সরকারের কোন অফিস কোন দলের ঠিকানা হোক, এটা আমরা চাই না। সরকারের অথবা প্রজাতন্ত্রের যারা কর্মকর্তা-কর্মচারী হবেন তারা হবেন জনগণের, তারা কোন দলের হবেন না, সেটাই আমরা চাই। তারা দক্ষতার সাথে এই দেশকে তারা সেবা দিয়ে যাবেন। যারা ব্যর্থ হবেন অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি দেশের দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, লেজ ধরে টানাটানি না করে কান ধরে টান দিলেই হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা লেজ আর পা ধরবো না, আমরা মাথার ওই যে ডান আর বামে কান আছে ওইটা ধরে টান দেবো। যাতে এই শাস্তি থেকে হেদায়াত প্রাপ্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে যায়।

তিনি কক্সবাজারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, এই কক্সবাজার এখন পর্যন্ত কেন হংকং হতে পারলো না, কেন এটা সাংহাই হতে পারলো না! কেন এটা সিঙ্গাপুর হতে পারলো না! পারলো না অসৎ, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা, ব্যাংক ডাকাতদের কারণে পারে নাই। ওরা জনগণ নিয়ে চিন্তা করে না। দারুণ দরদ এদের, নিজেই পড়ে আছেন বাংলাদেশে, আর সব চৌদ্দ-গোষ্ঠী পাঠিয়ে দিয়েছে বিদেশে। এরাই আমাদের দেশকে লুটেপুটে শেষ করে দিয়েছে।

ডা. শফিক বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি, দেশ থেকে যে আটাশ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনবো, ইনশাআল্লাহ। এবং সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। জনগণের উন্নয়নে ইনসাফ-ভিত্তিক সেটা ব্যয় করা হবে। কোন মামা-খালু, কোন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীর মুখ দেখা হবে না। যার যা পাওনা সেটা তাকে পৌঁছে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, কক্সবাজার এটা অপার সম্ভাবনার একটা পর্যটন এরিয়া। কিন্তু না, সেভাবে বিকশিত করা যায়নি। লুটেরাদের কারণে সেটা করা যায়নি।

তিনি কক্সবাজারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মানে দোকান খোলা না, সার্টিফিকেট তৈরির ফ্যাক্টরি না, সেই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেই শিক্ষা মানুষকে মানুষ বানাবে, এবং একই সাথে দেশ গড়ার কারিগর বানাবে। আমরা অ্যাকাডেমির থিউরিটিক্যাল এডুকেশনে বিশ্বাসী নই, আমরা মডার্ন ও প্রফেশনাল এডুকেশন আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দেবো, ইনশাআল্লাহ। কোন গরীবের সন্তান এই শিক্ষা থেকে বাদ পড়বে না। ওই শিশুর দায়িত্বও সরকারের।

ইতঃপূর্বে সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা মাঠে মিছিল নিয়ে দলে দলে জামায়াতে ইসলামির নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। মাঠ পূর্ণ হয়ে তা আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।

কক্সবাজার-০৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কক্সবাজার জেলা আমীর মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এসএম ফরহাদ, কক্সবাজার-০১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে জামায়াত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-০৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনে জামায়াত প্রার্থী শহীদুল আলম বাহাদুর (ভিপি বাহাদুর), জামায়াতের চট্টগ্রাম টিম সদস্য মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা নায়েবে আমীর অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন ফারুকী, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, এনসিপির কক্সবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ওমর ফারুক, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর কাশেম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, ইসলামি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি সিবগাত উল্লাহসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের জেলা পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

ইতঃপূর্বে সকালে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান কক্সবাজারের অন্যতম দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে আরেকটি নির্বাচনি জনসভায় অংশগ্রহণ করেন। ওই জনসভায় কক্সবাজার-০২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদকে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই সময় আরেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহানসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন