দৃষ্টিহীনতা জয় করে মর্যাদার লড়াইয়ে কিশোরগঞ্জের সোহাগ

উপজেলা প্রতিনিধি, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ)

দৃষ্টিহীনতা জয় করে মর্যাদার লড়াইয়ে কিশোরগঞ্জের সোহাগ
ছবি: আমার দেশ

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জাফরাবাদ গ্রামের সোহাগ মিয়া এক অনন্য মানবিক লড়াইয়ের নাম। শিশুকাল থেকেই গ্লুকোমা রোগে আক্রান্ত সোহাগ বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তিহীন, তবুও তিনি ভিক্ষাবৃত্তির মতো সহজ পথ বেছে না নিয়ে বেছে নিয়েছেন কঠোর পরিশ্রমের জীবন। গ্রামের একটি ছোট বাজারে টং দোকান ভাড়া নিয়ে পান, সিগারেট ও চানাচুর বিক্রির মাধ্যমে তিনি তার চার সদস্যের সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।

দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ায় আন্দাজের ওপর নির্ভর করেই তিনি গ্রাহকদের হাতে পণ্যের প্যাকেট বা পানের খিলি তুলে দেন। কোনো সহায়-সম্পদহীন এই মানুষটির বেঁচে থাকার এই অদম্য ইচ্ছা এবং আত্মমর্যাদাবোধ স্থানীয়দের কাছে তাকে এক উজ্জ্বল উদাহরণে পরিণত করেছে। অত্যন্ত সীমিত পুঁজির এই দোকানটিই বর্তমানে তার পরিবার পরিচালনার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী সোহাগ মিয়ার ভাষ্যমতে, তার এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা শুধু দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগও। নয়, দশ বছর বয়সে চিকিৎসকের পরামর্শে লেন্স স্থাপন করে কিছুটা দৃষ্টি ফিরে পেলেও, দীর্ঘ ২০-২৫ বছর পর সেই লেন্সের কার্যক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ায় তিনি আবারও অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছেন।

আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে পুনরায় দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, সরকারি সহায়তার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেও একটি প্রতিবন্ধী কার্ড না পেয়ে শেষে মৃত ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে ছয় হাজার টাকায় একটি কার্ড কিনতে হয়েছে তাকে।

দীর্ঘদিনের এই অবহেলা ও সরকারি সেবার অপ্রাপ্তি তার জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। দোকানের সামান্য পুঁজি দিয়ে মুদি মালামাল তোলা সম্ভব না হওয়ায় আয় বাড়াতে পারছেন না তিনি, যা তার সংসারের দৈনন্দিন চাহিদাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।

সোহাগের এই সংগ্রামের বিপরীতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন প্রকৃত প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কার্ডের জন্য তাকে ঘুষ বা অর্থের বিনিময়ে অন্য কারো কার্ড সংগ্রহের পথ বেছে নিতে হয়েছে, যা স্থানীয় সমাজসেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাবকে প্রকট করে তোলে।

সোহাগের স্ত্রী নাসিমা বেগম জানান, আর্থিক সংকটের কারণে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ এবং সোহাগের চিকিৎসা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। স্থানীয় এলাকাবাসী ও প্রতিবেশীরা সোহাগের আত্মমর্যাদাবোধকে সাধুবাদ জানালেও, তার এই লড়াইকে আরও সহজ করতে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

তারা মনে করেন, সোহাগের মতো সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি সমাজ গঠনের একটি অংশ। প্রয়োজনীয় পুঁজি ও চিকিৎসার সহায়তা পেলে সোহাগ হয়তো তার এই ক্ষুদ্র ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করে স্বাবলম্বী হতে পারতেন।

সোহাগ মিয়ার জীবনযুদ্ধ আমাদের সমাজের অবহেলিত ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অদম্য শক্তির প্রতীক। ভিক্ষাবৃত্তিকে না বলে পরিশ্রমকে বেছে নেওয়া এই মানুষটি প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা মানুষের আত্মমর্যাদাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তবে রাষ্ট্র ও বিত্তবানদের অবহেলায় এই লড়াই বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

যদি সঠিক সময়ে সরকারি সহায়তা এবং আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সোহাগের মতো আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিরা অকালে ঝরে পড়বে। কিশোরগঞ্জের এই প্রান্তিক মানুষটির জীবনমান উন্নয়নে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ এবং সমাজের বিত্তবানদের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে তার পরিবারকে অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করতে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...