আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কারখানার কেমিক্যালে হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জনজীবন

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী

কারখানার কেমিক্যালে হুমকির মুখে নদী তীরবর্তী জনজীবন

শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদী বেষ্টিত নরসিংদী। এর শাখা নদীগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া, পাহাড়িয়া, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অন্যতম। এসব নদ-নদীকে ঘিরে জেলার শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলেও কল-কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল নদীর পানিতে মিশে দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ কারণে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এসব নদ-নদী। হুমকির মুখে নদীর তীরের মানুষের জীবনযাত্রাসহ পরিবেশ-প্রতিবেশ। এ অঞ্চলের মানুষ ও স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এসব নদ-নদীকে রক্ষার জোরাল দাবি জানিয়েছেন ।

নরসিংদীবাসীর আশীর্বাদ হিসেবে খ্যাত আড়িয়ালখাঁ, হাঁড়িধোয়া, ব্রহ্মপুত্র, পাহাড়িয়া, মেঘনা শাখা নদী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। আর এর মধ্যে মেঘনা থেকে সৃষ্টি হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে সংযুক্ত হওয়া ৬০ কিলোমিটারের ব্রহ্মপুত্র অন্যতম। এসব নদী দিয়ে এক সময় বড় বড় জাহাজ আর পালতোলা নৌকা চলত। ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য করতে ছুটে আসতেন এ নদীপথেই। সেই থেকে জেলার নদী তীরে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকায় সংকুচিত হতে থাকে নদী । ফলে এখন বছরের বেশিরভাগ সময়ই নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় চলে না নৌকাও। এ অবস্থায় এসব নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস পেলে ২৩২ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন করে সরকার।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে নদী তীরের কলকারখানার ক্যামিকেল মিশ্রিত বিষাক্ত পানি পাইপের সাহায্যে নদীতে এসে পড়ায় পানি দূষিত হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমেও পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় বেঁচে থাকতে পারে না মাছসহ জলজ কোনো প্রাণী।

নদী নিয়ে ‘রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের’ গবেষণার ফলাফলে সবচেয়ে দূষিত নদীর তালিকার দ্বিতীয় স্থানে নরসিংদীর ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হাঁড়িধোয়া। এ নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ৬ এবং ক্ষারতার পরিমাণ চার দশমিক এক। এ কারণে এসব নদ-নদীর দূষিত পানি মানব স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিষাক্ত বর্জ্যে এ নদী এখন এলাকাবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এতে এখন আর মাছ পাওয়া যায় না, এমনকি পশুপাখির জন্যও এ পানির ব্যবহার সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হাঁড়িধোয়ার পানিতে নামলেই হচ্ছে খোস-পাচড়া, চর্মসহ নানা ধরনের মারাত্মক রোগ। এসব কারণে নদীর পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন একাধিকবার।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে নরসিংদীর নদ-নদীর পানি এতটাই বিষাক্ত হয়েছে যে, এতে মাছসহ জলজপ্রাণী বসবাসের অযোগ্য হয়ে তীরবর্তী আগাছা পর্যন্ত মারা যাচ্ছে। হাঁড়িধোয়া নদীর পর এবার খরস্রোতা শীতলক্ষ্যাও দূষণে পরিণত হচ্ছে।

এই নদীতে এক সময় বোয়াল, রুই, কাতলা, কাঁচকিসহ কম-বেশি সব প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বিগত কয়েক বছর ধরে বছরের শীতের মৌসুমে শীতলক্ষ্যার কাপাসিয়া থেকে ঘোড়াশাল পর্যন্ত নদীর সব মাছ মরে ভেসে উঠছে। এই অবস্থায় নদীর দুই তীরের মানুষের দাবিÑ নদীতে কারখানার দূষিত ক্যামিকেল মিশ্রিত বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে এ পানি মানুষের ব্যবহার উপযোগী করা।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলন (আপন)-এর সাধারণ সম্পাদক প্রলয় জামান বলেন, কিছু কলকারখানার বিষাক্ত গ্যাসের কারণে নদীর মাছ মারা যাচ্ছে। প্রতি বছর এভাবে নদী দূষণ হতে থাকলে ও মাছ মারা গেলে এক সময় পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হবে। এছাড়া দেশে মাছের আকাল দেখা দিলে আমিষের ঘাটতি দেখা দেবে। তাই এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

জানা যায়, নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদীর দূষণ রোধে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দশ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ দিয়েছেন। এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন এটি পানি উন্নয়নকে দেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে পানির দূষণ রোধ আর নদীর তীরে মানুষের হাঁটা-চলার ব্যবস্থা করার জন্য। এই বরাদ্দ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরকেও কিছু অর্থ দেওয়ার কথা রয়েছে তবে এক বছর হলেও তা এখনো পাওয়া যায়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. বদরুল হুদা জানিয়েছেন, নদীর পানি দূষিত হওয়ার কারণ ও মাছ মারা যাওয়ার বিষয়ে সঠিক তথ্য বের করে প্রতিকারের লক্ষে কাজ করছে অধিদপ্তর। তিনি আরো জানান, যারা নদী দূষণে দায়ী তাদের বিষয়ে নদীরক্ষা কমিশনের সভায় আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নদীগুলোর জলজপ্রাণী ও ইকোসিস্টেম রক্ষার জন্য অবশ্যই নদীদূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন