নরসিংদীর শিবপুরের হরনখোলা গ্রামের বাসিন্দা করিম মিয়া (৪৬)। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে প্রায় ১২ বছর আগে লেবাননে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে একটি খামারে চাকরি করতেন। তার উপার্জনের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো পরিবার।
দুই ভাইয়ের মধ্যে করিম ছিলেন ছোট। দেশে রেখে গেছেন স্ত্রী শরীফা বেগম, ১৩ বছরের ছেলে রাহিম এবং ১৮ মাস বয়সি মেয়ে নুসরাতকে। গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় করিমসহ চারজন একটি বাসায় অবস্থানকালে ইসরাইলি ড্রোন হামলার শিকার হন। এ সময় বাসার সবাই মৃত্যুবরণ করেন। মঙ্গলবার রাতে করিমের পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিশ্চিত হন।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ড্রোন হামলায় নিহত কাজম আলীর ছোট ছেলে করিম মিয়ার মৃত্যু সংবাদে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। গত মঙ্গলবার মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন করিমদের বাড়িতে।
নিহত করিমের স্ত্রী শরীফা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মারা যাওয়ার দুদিন আগে শেষ কথা হয়। কখনো ভাবেননি এ কথাই শেষ কথা হবে। তিনি বলেছিলেন, আর কিছুদিন গেলেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। এ সময় তিনি আমার কাছে দোয়াও চান। পরদিন একটি মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে। বারবার জানতে চাওয়া হয় ভালো আছি কি না। একপর্যায়ে জানানো হয়, করিম আর বেঁচে নেই। এ কথা শোনার পর আমার দুনিয়া যেন অন্ধকার হয়ে গেল। এখন সরকারের কাছে দাবি, আমার স্বামীর লাশটা শেষবারের মতো একবার দেখতে চাই।
নিহত করিমের বড় ভাই শরীফ শেখ বলেন, তারা চারজন একটি বাসার ভেতরে থাকাবস্থায় হঠাৎ থেকে একটি ড্রোন বাসার ওপর এসে পড়ে। ঘটনাস্থলেই করিমসহ মারা যায় চারজন। ১২ বছর আগে অনেক কষ্ট করে তাকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। এখন ভাইকে তো আর জীবিত পাব না, মৃত ভাইকে শেষবারের মতো দেখতে চাই।
করিমের মা ময়না বেগম ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, দুদিন হয়ে গেল এখনো আমার ছেলের সন্ধান পেলাম না। তাকে নাকি এখনো উদ্ধার করা যায়নি। সামনে কোরবানির ঈদে বাড়ি আসার কথা ছিল। আমি যাতে আমার ছেলেকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি, সরকারের প্রতি সে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। যত দ্রুত সম্ভব তাকে যেন দেশে আনার ব্যবস্থা করা হয়। করিমের সন্তানরাও যেন তাদের বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে পারে।
করিমের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে লেবাননের বৈরুতে অবস্থানরত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গত ১১ মে রাতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের মাইফাদুন এলাকায় আবাসস্থলে ইসরাইলি ড্রোন (এয়ার স্ট্রাইক) হামলায় চার বাংলাদেশি নিহত হন। এরমধ্যে নরসিংদীর শিবপুরের করিম নামে এক ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নরসিংদী জেলা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, লেবাননে ড্রোন হামলায় নিহত বাংলাদেশি চারজনের মধ্যে নরসিংদীর করিম মিয়া নামে একজন রয়েছেন বলে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে খোঁজ নিয়েছি। তার লাশ দেশে আনার বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

