আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সংরক্ষিত নারী আসন

প্রার্থী হতে খুলনা ও ময়মনসিংহের বিএনপি নেত্রীদের দৌড়ঝাঁপ

এহতেশামুল হক শাওন, খুলনা ও আব্দুল কাইয়ুম, ময়মনসিংহ

প্রার্থী হতে খুলনা ও ময়মনসিংহের বিএনপি নেত্রীদের দৌড়ঝাঁপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছে গত বৃহস্পতিবার। নির্বাচনের ঠিক এক মাসের মাথায় প্রথম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে জনমনে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস ছিল তুঙ্গে। টেলিভিশন ও মোবাইল লাইভে কোটি কোটি মানুষ দেখেছেন ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। বহু বছর পর আবারও গণমানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে জাতীয় সংসদ।

সাধারণ আসনের ভোট শেষ হতেই সংরক্ষিত আসনের জন্য দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপরতা শুরু করেন নারী নেত্রীরা। নিজেদের রাজনৈতিক প্রোফাইল তৈরি করে যোগাযোগ ও দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছিলেন দলীয় হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। আর সংসদ অধিবেশন শুরু হতেই তাদের সে তৎপরতা পৌঁছেছে চূড়ান্ত পর্বে। খুলনা-বাগেরহাট সংরক্ষিত আসনের জন্য বেশ কয়েকজন নেত্রীর নাম উঠে এসেছে, যারা বিভিন্নভাবে শীর্ষ নেতাদের মনোযোগ কাড়তে চেষ্টা করছেন। এদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে আলোচনায় উঠে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় সাবেক ছাত্রদল নেত্রী তানজীন চৌধুরী লিলির নাম।

বিজ্ঞাপন

সংরক্ষিত আসনের জন্য আলোচনায় রয়েছেন সাবেক এমপি, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও খুলনা মহানগর মহিলা দলের আহ্বায়িকা সৈয়দা নার্গিস আলী। তিনি এর আগে সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের হাত ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন তিনি। পরে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় মহিলা দল প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পান। এবারও মনোনয়ন পেতে তিনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুব্জ হলেও অভিজ্ঞতার জায়গায় এগিয়ে আছেন বলে তার ঘনিষ্ঠরা দাবি করছেন।

তালিকায় আরো রয়েছেন—খুলনা মহানগর বিএনপির সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দা রেহানা আখতার। তিনি খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক খ্যাতিমান সাংবাদিক সৈয়দ ঈসার সহধর্মিণী। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রেহানা আখতার শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত এবং বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা। বুদ্ধিবৃত্তিক মহল এবং রাজপথ—উভয় জায়গায় দক্ষতা দেখিয়েছেন, আন্দোলনে রাজপথ থেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। ফলে দল তার এ অবদানের মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদী তার অনুসারীরা।

ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা আজিজা খানম এলিজার নামও রয়েছে আলোচনায়। স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। সরকারি পাইওনিয়ার কলেজের দুইবারের ভিপি তিনি। খুলনা মহানগর মহিলা দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন। আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন, নাশকতা মামলার আসামি ছিলেন, রাজপথে কয়েক দফা হামলায় আহত হয়েছেন। পেশায় শিক্ষিকা এই নারী নেত্রী বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সংস্থার সঙ্গে জড়িত। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা হলে তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে করছেন অনেকে।

খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক দুইবারের ভিপি ফারজানা রশিদ লাবনীও প্রার্থিতার দাবিদার। তিনি খুলনায় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে শীর্ষ পদে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহসাংস্কৃতিক সম্পাদিকা ছিলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লাবণ্য’র নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করছেন। দেশের শীর্ষ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে কাজ করেন। রাজপথের আন্দোলনে এবং মামলার নিউজ কভারেজের সুবাদে মরহুম খালেদা জিয়ার নৈকট্য লাভ করেন। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি সামনে এনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

খুলনার আরেক নেত্রী নিঘাত সীমার নামও রয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়। জাতীয়তাবাদী তাঁতীদলের মহানগর আহ্বায়ক ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। মহিলা দল মহানগর আহ্বায়ক কমিটির ৫ নম্বর সদস্য সীমা ২০০২ সালে সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী হতে তৎপরতা চালান। তবে মাঝখানে কিছুদিন নীরব থেকে এখন আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে।

সব মিলিয়ে সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে খুলনায় চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ড কাকে মনোনয়ন দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এ প্রসঙ্গে খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন জানান, কয়েকজন নারী নেত্রী সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা আমাদের জানিয়েছেন। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

ময়মনসিংহে আলোচনায় তানজীন চৌধুরী লিলি

সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ময়মনসিংহ অঞ্চলে আলোচনায় উঠে এসেছে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় তানজীন চৌধুরী লিলির নাম। তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিন রাজপথের রাজনীতি, দলীয় আন্দোলন ও তৃণমূল সংগঠনকে সক্রিয় রাখার কারণে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছেন।

লিলি ১৯৯৬ সালে গৌরীপুর সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এ সময় তিনি প্রথমে শামসুন্নাহার হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী সময়ে ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে লিলি মামলা ও দীর্ঘদিন রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হন।

২০০৯ সালে গৌরীপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন তানজিন চৌধুরী লিলি। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিগত সরকারের সময় বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে একাধিক হামলা-মামলার শিকার হন তিনি। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতির পাশাপাশি গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারে মাঠে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন লিলি। নারীদের নিয়ে উঠান বৈঠক, ঘরোয়া বৈঠক ও গণসংযোগের মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান।

তানজীন চৌধুরী লিলি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করছি। আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম এবং দলের দুঃসময়ে পাশে থেকেছি। দলের নেতৃত্বের প্রতি সবসময় অনুগত থেকেছি। আমার বিশ্বাস, দলের নেতৃত্বই কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করবে।

তিনি আরো বলেন, আমার কাছে রাজনীতি শুধু ক্ষমতার বিষয় নয়; এটি অধিকার, ন্যায়বিচার ও সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব। মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির বিকল্প নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন