আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার মহিষ দুধের টক দই

শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর

শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী খাবার মহিষ দুধের টক দই

টক দই শেরপুরের মানুষের একটি প্রিয় খাবার। এক সময় শেরপুরের মানুষ টক দই আর খাঁটি আখের গুড় নিয়ে যেতেন আত্মীয়ের বাড়িতে। এতে খুশিও হতেন আত্মীয়স্বজনরা। এখনো এ এলাকার মানুষের অন্যতম স্বাদের খাবার এটা।

এ এলাকার মানুষ ভাত ও চিড়া-মুড়ির সঙ্গে দই ও খেজুরের গুড় মিশিয়ে খান। গরমের দিনে দই, পানি ও চিনি মিশিয়ে তৈরি করেন ঘোল। রোজার মাসে ইফতারের সময়ও থাকে এ টক দইয়ের নানা আইটেম। আগে অনেক এলাকায় কৃষকের ঘরে ঘরে মাটির হাঁড়িতে গরু ও মহিষের দুধ দিয়ে পাতা হতো দই। সব জায়গায় মিলত টক দই তবে এখন আর সব জায়গায় পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সপ্তাহে দুদিন বসে টক দইয়ের এক ব্যতিক্রমী হাট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সাধারণ কোনো গ্রামীণ বাজার। কিন্তু ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে সারি সারি মাটির হাঁড়ি কাপড় দিয়ে ঢাকা। পাশে বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা এগিয়ে এলে খুলে যায় ঢাকনা। ভেসে আসে দুধের ঘ্রাণ। এটি ঘন, সাদা, প্রাকৃতিকভাবে জমাট বাঁধা মহিষের টক দই। বুধ ও শনিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ হাট। জেলা পেরিয়ে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন শুধু টক দই কিনতে। প্রতি কেজি দই বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। দই তৈরিতে নেই কোনো কৃত্রিম উপকরণ, অতিরিক্ত তাপ বা রাসায়নিক। প্রতি হাটে ১০-১৫ মণ পর্যন্ত দই বিক্রি হয়। বিক্রেতাদের ভাষ্য, প্রথমে মহিষের দুধ সংগ্রহ করে পরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে ঢেলে ঢাকনা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। তিন দিন পর স্বাভাবিকভাবেই দুধ জমে তৈরি হয় ঘন টক দই। মহিষের দুধের উচ্চ ফ্যাট ও ঘনত্বের কারণেই এটি আলাদা করে জ্বাল দেওয়া বা বীজ মেশানো ছাড়াই জমে যায়। তাই এ দইয়ের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

হাটে আসা শ্রীবরদী উপজেলার শনিরচর গ্রামের জুয়েল মিয়া বলেন, হাঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে সামান্য শর্ষের তেল মেখে রোদে বা হালকা তাপে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তারপর ছেঁকে রাখা তাজা দুধ তিন দিনের মধ্যেই জমে দই তৈরি হয়। এতে আলাদা কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। একেকটি হাঁড়িতে দুই থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই বসানো যায়। এক কেজি দইয়ের জন্য লাগে এক লিটারের কিছু বেশি দুধ। একটি মহিষ থেকে দিনে তিন-চার লিটার দুধ মেলে। অনেক পরিবার দুদিন দুধ জমিয়ে তৃতীয় দিনে দই বসান, এরপর হাটে নিয়ে আসেন। ঝগড়ারচর গ্রামের আবদুল হালিম প্রায় ৩০ বছর ধরে এ হাটে দই বিক্রি করছেন। তার তিনটি মহিষ আছে। তিনি দুদিনে প্রায় ২৪ কেজি দুধ সংগ্রহ করে দই তৈরি করেন। তিন দিন পর সেই দই বিক্রি করতে নেন। তিনি বলেন, এখানে মহিষের দুধ খাওয়ার চল কম, সবাই দই খায়। প্রতি হাটে ১০-১৫ মণ পর্যন্ত বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায় আমাদের দই।

মো. বাবু নামে আরেক দই বিক্রেতা বলেন, ‘টক দই খেলে অনেক রোগের উপশম হয়। গ্যাস্ট্রিক, হজমের সমস্যায় উপকার হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের মিষ্টি দই খাওয়া নিষেধ। তাই তারা টক দই খান। আমরা সপ্তাহে দুদিন দই বিক্রি করি। আমাদের দই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মোবাইলে অর্ডার করেও নিচ্ছেন মানুষ।’ জামালপুর থেকে আসা দই ক্রেতা মো. হোসেন আলী বলেন, ‘আমরা এ বাজার থেকে টক দই কিনে খাই। এ দই খেতে অনেক সুস্বাদু।’

জামালপুর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাদিম হাসান বলেন, ‘দইয়ের সবচেয়ে উপকার হচ্ছে দই সহজপাচ্য। এতে প্রোবায়োটিক থাকায় হজম শক্তি বাড়ে। মিষ্টি দইয়ের চেয়ে টক দই ভালো। কেননা মিষ্টি দইয়ে চিনি মোশানো হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমরা রোগীদের টক দই খাওয়ার জন্য সাজেস্ট করে থাকি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...