জলাবদ্ধতায় ডুবছে শহর, ‘আনন্দ ভ্রমণে’ পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তারা

জেলা প্রতিনিধি, জামালপুর

জলাবদ্ধতায় ডুবছে শহর, ‘আনন্দ ভ্রমণে’ পৌর প্রশাসনের কর্মকর্তারা

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত জামালপুর শহরের জনজীবন যখন কার্যত স্থবির, ঠিক সেই সময় পৌর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি খরচে কক্সবাজার সফরে থাকার অভিযোগে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

রোববার দুপুরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে শহরের শেখেরভিটা রেলক্রসিং এলাকায় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন পানিবন্দি এলাকাবাসী। এতে দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার এক্সপ্রেস প্রায় এক ঘণ্টা আটকা পড়ে। অবরোধের কারণে সড়ক যোগাযোগও ব্যাহত হয় এবং সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

বিজ্ঞাপন

এর আগে শহরের বেলটিয়া এলাকাসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধ অঞ্চলের বাসিন্দারা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করছে।

অভিযোগ করা হয়েছে পৌর প্রশাসক মৌসুমি খানম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানসহ প্রায় ১৫ জন কর্মকর্তা বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, লাইসেন্স বিভাগ, পানি ও বাজার বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

ভ্রমণে থাকা কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছেন—মৌসুমি খানম (পৌর প্রশাসক), হাফিজুর রহমান (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা), শফিকুল ইসলাম (হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা), শরিফ উদ্দিন (হিসাব সহকারী), নুর মোহাম্মদ (প্রকৌশলী), আকতার হোসেন ও সোহেল (সহকারী প্রকৌশলী), জাহাঙ্গীর আলম ও আল আমীন সুমন (লাইসেন্স বিভাগ), শফিকুল আলম (পানি বিভাগ), আরিফ হোসেন (বাজার পরিদর্শক), লিয়াকত আলী (কনভারজেন্সি), নুরনবী রতন (কর নির্ধারক), আরিফুল ইসলাম রবিন (সার্ভেয়ার)সহ আরো কয়েকজন।

স্থানীয়দের দাবি, টানা বর্ষণে শহরের নিম্নাঞ্চলগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ডুবে যাওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থির ও নোংরা পানিতে বসবাস করায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্করা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা বলেন, “আমরা পানির মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছি, আর তারা জনগণের টাকায় ঘুরতে গেছে—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

জামালপুর পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম জানান, পৌর এলাকার অন্তত ১০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ জলাবদ্ধতায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হবে।

অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে পৌরসভার কর নির্ধারক শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা ভ্রমণে থাকলেও নিয়মিতভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। কাজ আগের চেয়ে বেশি গতিতে চলছে।”

পৌর প্রশাসক মৌসুমি খানম বলেন, “বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়ে কক্সবাজারে এসেছি। মাত্র একদিন কর্মদিবস মিস হয়েছে। সোমবার থেকে অফিসে যোগ দেব। ভ্রমণে অবস্থান করেও পৌরসভার কার্যক্রম মনিটরিং করা হচ্ছে এবং শেখেরভিটা এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে ‘’

তবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সচেতন মহলের মতে, এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দায়িত্ব জনগণের পাশে থাকা। কিন্তু এই সময়ে কর্মকর্তাদের ভ্রমণ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন