জামালপুর জেলা বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন চরমে পৌঁছেছে। এ কারণে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে জামালপুর বিএনপির নেতাকর্মীরা। বর্তমানে জামালপুরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ এই কোন্দলই রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। দিন দিনই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। এতে করে নেতাকর্মীদের মাঝে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, জামালপুর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের চাপা দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে । এতে করে প্রায়ই দলীয় কোন্দলে ছোট-খাটো সহিংসতার ঘটনা ঘটছে । যেকোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা বিএনপির রাজনীতি বর্তমানে অন্তত চারটি বলয়ে বিভক্ত। সদর আসনের এমপি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওয়ারেছ আলী মামুনের নেতৃত্বে ‘মামুন গ্রুপ’, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খানের নেতৃত্বে ‘সোহেল গ্রুপ’, জেলা বিএনপির সহসভাপতি শামীম আহমেদের নেতৃত্বে ‘শামীম গ্রুপ’ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজ মিয়ার নেতৃত্বে ‘ফিরোজ গ্রুপ’ পৃথকভাবে দলীয় নানা কর্মসূচি পালন করছে। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রুপিং আরো তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, বালুমহাল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক সুবিধা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করেই এই বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সুবিধাভোগের অভিযোগ এনে একের পর এক ভিডিও ও অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গত ১৯ এপ্রিল ব্রহ্মপুত্র নদের চর যথার্থপুর-ছনকান্দা ঘাটের বালুমহালের ইজারার দরপত্র জমা হয় সদর উপজেলা প্রশাসনে। পরে ইজারা পায় ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শামীম মাস্টারের স্ত্রী রাবেয়ার মালিকানাধীন ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’। ইজারা না পাওয়া জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সোবহানের অনুসারীরা অভিযোগ করেন দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি করা হয়েছে। তাদের দাবি, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মিলন ও জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম নেগোসিয়েশনের নামে অংশগ্রহণকারীদের দরপত্র থেকে বিডি সরিয়ে দেন এবং পরিকল্পিতভাবে শামীম এন্টারপ্রাইজকে ইজারা পাইয়ে দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা, পরে তা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রূপ নিয়েছে।
এরই মধ্যে জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সোবহান ও জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিও ও অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। পরে আব্দুস সোবহান সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, ‘বালুমহাল ইজারা নিয়ে টেন্ডার সিন্ডিকেট গড়ে তুলে প্রতারণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শামীম মাস্টার পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর নামে যথাযথ নিয়ম মেনেই বালুমহালের ইজারা নেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের কারসাজি হয়নি। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন মিলন বলেন, বালুমহাল নিয়ে চলমান ঘটনায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব সোহেল রানা খান বলেন, সোহেল গ্রুপ অডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে, এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একাধিক পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন, ফেসবুক লাইভ ও ভিডিও বার্তায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে জেলা বিএনপি। অনেক নেতাকর্মী আশঙ্কা করছেন, এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকলে সাংগঠনিক ঐক্য আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবির তালুকদার শামীম এমপি বলেন, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই বালুমহালের ইজারা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা কাম্য নয়। সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানাই। তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওয়ারেছ আলী মামুন এমপির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব