ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার খন্দকপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক মো. রফিক মিয়া (৫৫) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ সেবন তার জন্য জরুরি। এ জন্য তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) কর্নারে নিয়মিত ফলোআপে আসেন। তবে সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
রফিক মিয়া বলেন, আগে তাদের এলাকায় উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এমন নির্দিষ্ট কোনো সেবা ছিল না। রক্তচাপ মাপার জন্যও নির্দিষ্ট কোনো কক্ষ বরাদ্দ ছিল না। এখন তিনি নিয়মিত এনসিডি কর্নারে এসে রক্তচাপ মাপাতে পারছেন এবং চিকিৎসক ও নার্সের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করছেন। তবে উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কার্যক্রম পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। প্রাপ্যতা অনুযায়ী এক মাসের ওষুধ পেলেও সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের দীর্ঘ সময়, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন, নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় থাকতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মানুষের আয়ু বাড়ছে, জীবনযাত্রা ক্রমেই কম কায়িক পরিশ্রমনির্ভর হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে এবং দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে। এর সঙ্গে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)।
দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ মৃত্যু হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকজনিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ হাইপারটেনশন কন্ট্রোল ইনিশিয়েটিভের আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কাঠামোবদ্ধ সেবা জোরদার করা হচ্ছে।
এনসিডি কর্নারে রোগীদের নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এবং নিয়মিত ফলোআপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোক হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এনসিডি কর্নারে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, রোগী শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ সেবন বন্ধ হয়ে গেলে রোগীর হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এনসিডি সেবার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ পর্যাপ্ত জনবল না থাকা। এনসিডি কর্নারগুলোকে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত মানের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া ওষুধের পাশাপাশি রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের পর্যাপ্ততা ও কার্যকারিতাও এনসিডি সেবা চালু রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. জাকির হোসাইন বলেন, উপজেলা পর্যায়ে এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগীরা নিজ এলাকার কাছাকাছি নিয়মিত চিকিৎসা পাচ্ছেন। এতে রোগীরা সময়মতো ফলোআপে আসছেন এবং তাদের কন্ট্রোল রেটও ভালো পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা, যেমন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এনসিডি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ডা. জাকির হোসাইন জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২০২৫ সালের শেষের দিকে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সরকারি ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই ওষুধ প্রায় শেষের দিকে। এনসিডি কর্নারে পর্যাপ্ত ওষুধ না থাকলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ময়মনসিংহ জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. ফখরুল হাসান চৌধুরী জানান, ময়মনসিংহ জেলার আওতায় বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার উচ্চ রক্তচাপের রোগী এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, এই কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রোগীদের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে অপারেশনাল প্ল্যান না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের এমএসআর ফান্ড ব্যবহার করে ওষুধ কেনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমএসআর ফান্ড থেকে ইনডোরসহ অন্যান্য অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রীও কেনা হয়। ফলে এনসিডি প্রোটোকল অনুযায়ী পর্যাপ্ত ওষুধ কেনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এনসিডি কর্নারে ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ময়মনসিংহ জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।
বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উপজেলা পর্যায়ের এনসিডি কর্নারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে রোগী শনাক্ত ও নিবন্ধনের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, পর্যাপ্ত জনবল এবং ফলোআপ নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

