নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতে ফসলরক্ষা বাঁধে ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে কৃষকের মনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ নিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক। জানা গেছে, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার কবল থেকে একমাত্র বোরো ফসল রক্ষার জন্য প্রতি বছর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়।
এ বছরও কিছুটা বিলম্বে হলেও ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। সরকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রতি বছর কাবিটা প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করে থাকে। কয়েক বছর ধরে নেত্রকোনায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ হয় না। এলাকাবাসীর দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) স্কিম কমিটির স্বেচ্ছাচারিতায় এ বছর অনভিজ্ঞ লোকদের দিয়ে পিআইসি কমিটি গঠন করা হয়।
ফলে আগাম বন্যা ও ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের চৌতারা হাওরে বাঁধে ধস ও লিপসিয়া পিআই নদীর বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোয়ও ভালোভাবে কাজ করা হয়নি। কিছু প্রকল্পে নামমাত্র মাটি কাটার অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের এক মাসেও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোয় বস্তা ফেলার কাজ শেষ হয়নি। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোয় বস্তা ও বাঁশ দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কিছুই দেওয়া হয়নি। তবে পাউবোর দাবি, হাওরের পানি নামতে বিলম্ব হওয়ায় কাজ শুরু ও শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির আতঙ্ক বিরাজ করছে।
খালিয়াজুরী উপজেলার চৌতারা হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধে ধস ও পিআই নদীর বাঁধের ফাটল ধরার বিষয়টি স্বীকার করে পাউবোর (এসও) উপসহকারী প্রকৌশলী এনায়েত হোসেন ও মুস্তাফিজুর রহমান জানান, বস্তা ফেলার কাজ করা হচ্ছে। পিআই নদী বাঁধের ফাটল মেরামত করে বস্তা ফেলে বাঁশ দেওয়ার কথা পিআইসিকে বলা হয়েছে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার পাঁচ উপজেলায় ফসলরক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় ৩৬৫ কিমি অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে। হাওরে এক সময় ঠিকাদারদের মাধ্যমে ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণ করা হতো। ২০১০ সালে হাওরে ব্যাপক ফসলহানির পর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ড ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে।
প্রতিটি প্রকল্পের জন্য প্রকৃত কৃষক ও স্থানীয় সুবিধাভোগীদের নিয়ে পাঁচ-সাত সদস্যের কমিটি (পিআইসি) গঠন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি পিআইসি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারে। এবার নেত্রকোনায় ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। আর বাঁধগুলোর আওতায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। হাওরে ১৩৬ দশমিক ৭৯৮ কিমি বাঁধ মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২টি পিআইসির মাধ্যমে প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩১ কোটি টাকা ধরা হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে এসব প্রকল্পের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার জন্য পিআইসি কমিটিকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
চাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ফজলু মিয়া বলেন, ‘চৌতারা হাওরের বাঁধে ধস ও পিআই নদীর বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনকে নিয়ে ধসে যাওয়া বাঁধ পরিদর্শন করেছি। তাদের দ্রুত মেরামত করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।’
খালিয়াজুরী কাবিটা স্কিমের সভাপতি ও খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, ‘কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ফসলরক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনকে নিয়ে ওই সমস্ত জায়গা পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রকল্পের লোকজনকে দ্রুত মেরামতের জন্য বলা হয়েছে।’
নেত্রকোনা জেলা কাবিটা স্কিমের সদস্য সচিব ও নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘বৃষ্টি হওয়ায় নদ-নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে। ফসলরক্ষা বাঁধের কয়েক জায়গায় ধস দেখা দিয়েছিল। ওইসব জায়গা মেরামত করা হয়েছে।’
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাবিটা স্কিমের সভাপতি খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ফসলরক্ষা বাঁধগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। ওগুলো দ্রুত মেরামতের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

