আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ডিজেল সংকটে উত্তরাঞ্চলে সেচ বন্ধ, হুমকিতে বোরো উৎপাদন

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

ডিজেল সংকটে উত্তরাঞ্চলে সেচ বন্ধ, হুমকিতে বোরো উৎপাদন

চলমান জ্বালানি সংকটের ফলে বিপাকে পড়েছেন দেশের উত্তরাঞ্চলের বোরো ধান চাষিরা। ডিজেলের অভাবে ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না তারা। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ডিজেলের অভাবে সেচ পাম্প, নলকূপ ও কৃষিযন্ত্র বন্ধ আছে। এতে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

কৃষকদের অভিযোগ, রাজশাহীর অধিকাংশ পাম্প বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় ডিজেল মিলছে না। আবার পাম্পের বাইরে খোলা বাজারে যেখানে ডিজেল মিলছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়ে জর্জরিত কৃষকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিন দেখা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়ারমানিক চর এলাকায় সেচের জন্য ডিজেল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি জানান, গত চারদিনে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সেচ খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আগে থেকেই উৎপাদন খরচ বেশি। তার ওপর বাড়তি দাম আমাদের আরো বিপাকে ফেলছে।

নওগাঁর দুর্গাপুর উপজেলার বাজে কলশিপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর জানান, বেশ কয়েকটি পেট্রোল পাম্প ঘুরেও ডিজেল পাননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে লিটারপ্রতি ১২০ টাকা দরে কিনতে হয়েছে।

একই উপজেলার ছিদ্রো কলশিপুর গ্রামের মোসলেম উদ্দিন আরো করুণ অবস্থার বর্ণনা দিয়ে জানান, বুধবার পুরো বাজার ঘুরেও এক লিটার ডিজেল পাননি। তার বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। বিক্রেতাদের লিটারপ্রতি ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছিলেন। তারাও সংকটের কথা বলে দিতে রাজি হননি। নিজের বোরোক্ষেত নিয়ে অনেক উদ্বেগে আছেন তিনি।

এদিকে সেচ পাম্পের চালকরা জানান, ডিজেলের অভাবে তাদের সেচ কার্যক্রম চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সংকটের কারণে তারা সেচের খরচ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে প্রায় তিন লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এ অঞ্চলে সেচের মূল চালিকাশক্তি ডিজেলনির্ভর হওয়ায় বর্তমান জ্বালানি সংকটের ফলে বিশাল এলাকাজুড়ে বোরোক্ষেতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এ অঞ্চলে মোট সেচনির্ভর জমির প্রায় ২১ শতাংশই ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। অঞ্চলটিতে মোট গভীর নলকূপ রয়েছে ১১ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ৩১৫টি। অগভীর নলকূপের সংখ্যা এক লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ৮৮ হাজার ২৬৮টি। এছাড়া আট হাজার ৬৪৭টি লো-লিফট সেচ পাম্পের মধ্যে সাত হাজার ৪৫৮টি ডিজেলচালিত।

এ অবস্থায় কৃষি অর্থনীতিবিদরা জ্বালানি বণ্টনে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, এটি যৌক্তিক। কিন্তু জ্বালানি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথমে কোন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।

কৃষিবিদ আব্দুস সালাম বলেন, বোরো ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এটি সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ সেচ দেওয়া হয় ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে। তাই এ সময়ে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বিদ্যুতের মতো ডিজেলের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যাতে কৃষকরা উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে পারেন।

তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান দাবি করেন, ডিজেল সংকট বা বেশি দামে বিক্রির কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। তার দাবি, সারা দেশে সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে কৃষকদের ভাষ্য ভিন্ন। জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে সেচ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং চলতি বছর বোরো ধান উৎপাদন গুরুতরভাবে হুমকির মুখে পড়বে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন