আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার নিষিদ্ধ, বিপাকে কৃষক

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার নিষিদ্ধ, বিপাকে কৃষক
ফাইল ছবি

বৃহত্তর রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করে গেজেট জারি করেছে সরকার। হঠাৎ সেচ ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্তে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি খাত নিয়ে গভীর সংকটের আশঙ্কা করছেন তারা।

জানা গেছে, বিকল্প সেচব্যবস্থা কিংবা ভর্তুকি ছাড়া সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে চলতি মৌসুমেই প্রায় ২৭ লাখ টন ফসল উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া প্রায় ২৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি জারিকৃত গেজেটে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার বরেন্দ্র এলাকার ৪ হাজার ৯১১ মৌজাকে ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়। এতে খাওয়ার পানি ছাড়া সেচসহ অন্য যেকোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গেজেটে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে পরিবেশ সুরক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাসের কথা তুলে ধরা হয়। তবে কৃষিকাজ কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা, বিকল্প সেচব্যবস্থা কিংবা ক্ষতিপূরণের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এতে এ অঞ্চলের কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ এলাকা বরেন্দ্র অঞ্চল। উঁচু-নিচু ভূমি, লালচে কাদামাটি ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে এখানকার কৃষি দীর্ঘদিন ধরেই সেচনির্ভর। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) মাধ্যমে সরকার হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে বোরো ধানসহ সেচনির্ভর ফসল চাষে উৎসাহ দেয়। এ নীতির ফলে শস্য বিন্যাস, ভূমি ব্যবহার, ঋণব্যবস্থা এবং গ্রামীণ জীবিকা আমূল বদলে যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলের পুরো অর্থনীতি গড়ে ওঠে নলকূপনির্ভর সেচব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে।

স্থানীয় কৃষক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বরেন্দ্র এলাকার কৃষি বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, গেজেট জারির আগেই তারা বীজ, সার ও জমি প্রস্তুতে বিনিয়োগ করেছেন। এখন সেচ বন্ধ হলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। অথচ কোনো সহায়তার নিশ্চয়তা নেই।

নওগাঁর সাপাহার ও পোরশা উপজেলার কৃষকেরা জানান, সেখানে কার্যকর কোনো ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস নেই। খালগুলো ভরাট, জলাধার সীমিত এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থাও নেই।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক ও স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ বলেন, বরেন্দ্র কোনো অনাবাদি অঞ্চল নয়। ধান থেকে সবজি--এখানকার সবকিছুই সেচনির্ভর। কৃষকদের সঙ্গে কথা না বলে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গেজেটে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের দায় কৃষকদের ওপর চাপানো হলেও এ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা উপেক্ষা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, গেজেটে পরিবেশ সুরক্ষা ও কৃষি বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় নেই। এমনকি বিকল্প উন্নয়নের দায়ভার কার, তা-ও স্পষ্ট নয়। এ ধরনের অসম প্রয়োগ পরিবেশ সুরক্ষা যেমন ব্যাহত করবে, তেমনি পানি ব্যবস্থাপনায় মানুষের আস্থাও নষ্ট করবে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অভিজিৎ রায় বলেন, এই ব্যবস্থা কৃষকেরা তৈরি করেননি। রাষ্ট্রই এটির পরিকল্পনা করেছে, অর্থায়ন করেছে এবং পরিচালনা করেছে। এখন কোনো বিকল্প না দিয়েই বড় এলাকাজুড়ে ভূগর্ভস্থ পানি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। এটি ঠিক নয়।

তিনি আরো বলেন, পানির সংকট বাস্তব, পরিবর্তন দরকার। কিন্তু হঠাৎ কৃষকদের থামিয়ে দিলে তা কাজ করবে না। ধাপে ধাপে এবং বিকল্প দিয়ে এগোতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরই এ সিদ্ধান্ত বাস্তাবায়ন করা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ বিষয়ে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) তারিকুল ইসলাম বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এ গেজেট কার্যকর করা বাস্তবসম্মত নয়। এটি বাস্তবায়ন করা হলে ২৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকবে এবং চলতি মৌসুমেই প্রায় ২৭ লাখ টন ফসল উৎপাদন কমে যাবে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আমরা ফসল ফলানো এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কৃষিকাজ চালু রাখার অনুরোধ জানিয়েছি।

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজের গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম বলেন, পানি সংরক্ষণনীতি হতে হবে ধাপে ধাপে। আগে নিষেধাজ্ঞা পরে সমাধান--এভাবে চললে ক্ষুদ্র কৃষকেরা কৃষি থেকে ছিটকে পড়বেন।

হঠাৎ চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলে অভিবাসন, ঋণ ও সামাজিক সংকট বাড়তে পারে। তাই অবিলম্বে গেজেট পুনর্বিবেচনা, কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য অন্তর্বর্তী সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এসআই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন