আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘গোশত সমিতি’

এ যেন রোজার ঈদে কোরবানির আমেজ

সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী (রাজশাহী)

এ যেন রোজার ঈদে কোরবানির আমেজ

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ঈদ ঘিরে কয়েক বছর ধরে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে গোশত সমিতি। এ যেন রোজার ঈদে কোরবানির আমেজ। ঈদের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে গরু কেনেন, এতে ঈদের আগে থেকেই এর আমেজ শুরু হয়। এতে ওই এলাকার অসচ্ছল পরিবারগুলো ঈদে বাড়তি আনন্দ পায় এবং তাদের ওপর আর্থিক চাপও কমে যায়। পাড়া বা মহল্লায় সমিতিগুলো ‘গোশত সমিতি’ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

শুরুতে শুধু নিম্নবিত্ত মানুষ এ ধরনের সমিতি করলেও এখন মধ্যবিত্তরাও এসব সমিতির সদস্য হচ্ছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এ ধরনের সমিতি করেছেন।

এ সমিতি এখন নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। মাসে ৩০০ টাকা সঞ্চয় হওয়ায় কারও তেমন সমস্যা হয় না। জানা গেছে, উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় সহস্রাধিক সমিতি গড়ে উঠেছে। ‘গোশত সমিতি’ এখন ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।

ঈদের সময় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গোশতের চাহিদা পূরণ করছে। সারা বছর একটু একটু করে সঞ্চয় করে ঈদের আগে পশু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেন মাংস সমিতির সদস্যরা। এতে করে ঈদে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাড়তি আনন্দ পায় এবং তাদের আর্থিক চাপও কমে যায়।

দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বাজার থেকে মাংস কিনতে পারেন না স্বল্প আয়ের মানুষ। ৫-৭ বছর ধরে এ অবস্থা চলছে। মাংস কেনার টার্গেট নিয়ে গ্রামীণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ ‘গোশত সমিতি’ করে বছরজুড়ে টাকা জমানো শুরু করেছেন। বছর শেষে তারা নিজেদের জমানো টাকা দিয়ে গরু কিনে মাংস ভাগ করে নিচ্ছেন। এতে বাজারে কসাইদের হাঁকানো দরের চেয়ে কম দামে তারা ফ্রেশ মাংস পাচ্ছেন। উপজেলাজুড়ে প্রায় গ্রামেই এমন একাধিক গোশত সমিতি গড়ে উঠেছে। তবে এতে বিপাকে পড়েছেন পেশাদার মাংস বিক্রেতারা। তারা জানিয়েছেন, ঈদের মৌসুমে তাদের ব্যবসা আগের চেয়ে অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।

‘গোশত সমিতি’র সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম বা মহল্লায় ঈদুল ফিতর সামনে রেখে এ ধরনের গোশত সমিতি গঠন করা হয়। সমিতির মেয়াদ এক বছর। সমিতির অন্তর্ভুক্ত প্রতিজন সদস্য মাসে মাসে সমিতিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখেন। বছর শেষে ঈদের আগে জমাকৃত অর্থ একত্র করে পশু কেনা হয়। ঈদের দু-এক দিন আগে এই পশু জবাই করে গোশত সমিতির প্রত্যেক সদস্যকে ভাগ করে দেওয়া হয়। এতে ঈদ উদ্‌যাপনের ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর আর্থিক চাপ যেমন কমে, তেমনি ঈদের আগে সবাই বাড়তি আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে এমন সমিতি গড়ে উঠছে। প্রতিটি গোশত সমিতির সদস্যসংখ্যা ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্থানীয়দের ভাষায়, এই সমিতির নাম ‘গোশত বা মাংস সমিতি’। অনেকের কাছে ‘গরু সমিতি’ নামেও পরিচিত।

গোশত সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিবছর বাড়ছে গোশত সমিতির সংখ্যা। গোশত সমিতির প্রত্যেক সদস্য প্রতি মাসে ৩০০ -৫০০ টাকা চাঁদা জমা দেন। জমা করা টাকায় গরু কিনে এনে ঈদের দুই এক দিন থেকে শুরু হয় পশু জবাইয়ের কাজ চলে ঈদের দিন পর্যন্ত। পরে সমিতির সদস্যরা গোশত ভাগ করে নেন। এরপর পরের বছরের জন্য তহবিল গঠন করে সমিতির কার্যক্রম চলে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বেজড়া প্রামের গোশত সমিতির মূল উদ্যোক্তা আব্দুল আওয়াল জানান, সমিতিতে এবার ৫৩ জন সদস্য। প্রতি মাসে সদস্য প্রতি ৩০০ টাকা করে অর্থ জমা রাখেন। বছর শেষে রোজার ঈদের আগে জমানো টাকা দিয়ে গরু কিনে জবাই করে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তুলনামূলক বাজার দরের চেয়ে কম দামে এবং ফ্রেশ মাংস একসঙ্গে বেশি পরিমাণ পেয়ে প্রত্যেকেই খুব খুশি হয়।

তিনি জানান, তিন বছর আগে তিনি গ্রামের কয়েক বন্ধুর সঙ্গে উদ্যোগ নিয়ে এ গোশত সমিতি গঠন করেন। সমিতির মাধ্যমে গরু কিনে মাংস ভাগ করায় কম দামে ফ্রেশ মাংস পাওয়ায় গ্রামের লোকজন ব্যাপক উৎসাহিত হয়। এতে পরের বছর সদস্য সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এ বছর তাদের সমিতিতে ৫৩ জন সদস্য হওয়ার পর আরও অনেকের আসার ইচ্ছা থাকলেও নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মহিশালবাড়ী মহাল্লার সমিতির এক সদস্য মুখলেস জানান, তারা সারা বছর ধরে মাসে মাসে টাকা জমা দিয়েছেন। এতে বছর শেষে ৩৬শ টাকা জমা হয়েছিল, তিনি টেরই পাননি। কিন্তু এখন একবারে ৩৬শ টাকা দিয়ে তিনি মাংস কিনতে পারতেন না। এছাড়া এখানে যে দাম পড়ছে সে দামে কসাইরা মাংস বেচে না। তাতে ওজনে কম, পানি দেওয়া ও তেল-চর্বি, হাড় দিয়ে ভরা থাকে।

মহিশালবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক জিয়াউল জানান, গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তসহ সব শ্রেণির মানুষ এ সমিতিতে সদস্য হয়েছেন। সদস্যরা বছরে অল্প অল্প করে টাকা জমা রাখেন বলে বছর শেষে তারা টেরই পান না যে এত টাকা হয়েছে। এ পদ্ধতি না থাকলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে ৫-১০ কেজি মাংস কেনার সাধ্য হত না।

এদিকে মাংস বিক্রেতা রেজাউল জানান, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তারা আগে যে মাংস বিক্রি করতেন তা এখন অর্ধেকও হচ্ছে না। কারণ গ্রামে গ্রামে একাধিক গোশত সমিতি হয়েছে। সমিতির লোকজন নিজেরাই গরু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করেন।

ডাইংপাড়া বনিক সমিতির সভাপতি আসাদুজ্জান মিলন জানান, জনসাধারণের এমন সমিতি গঠনের ফলে মাংস ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে। মানুষ ভালো মানের মাংস কম দামে পাচ্ছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে গোশত সমিতি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শায়লা শারমিন জানান, সুস্থ সবল গরু জবাই করে জনসাধারণ আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছেন। ভোক্তারা যেমন উপকৃত হচ্ছেন তেমনি গো খামারিরা ঈদুল ফিতরেও একটি বাজার ধরতে পারছেন। এতে খামারি ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হচ্ছেন। সমিতিগুলোর পরিচালকরা যদি সরাসরি খামার থেকে পশু সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন তাহলে তারা অফিস থেকে তাদের সহযোগিতা করবেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন