কুড়িগ্রাম জেলায় টানা অতিভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন সরকারি অফিস, সড়ক ও নিম্নাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নভূমির বোরো ধানের ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাইড্রোলজি বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিস ১৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জজ কোর্ট, প্রাইমারি টিচার্স ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট, জেলা খাদ্যগুদাম ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসহ একাধিক সরকারি স্থাপনায় হাঁটুসমান পানি জমেছে। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসা সেবাগ্রহীতা রবিউল ইসলাম বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বহু বছর ধরে এই সমস্যা চলছে, কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।”
এদিকে টানা বৃষ্টিতে জেলার চরাঞ্চলের বোরো ধানের ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে ডুবে গেছে। আবার অনেক কৃষক কাটা ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে বিপাকে পড়েছেন। পানিতে ভিজে খড় ও ধান পঁচে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট চরের কৃষক চাঁন মিয়া বলেন, “ডিজেলের সংকটের মধ্যেও কষ্ট করে এক বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। দ্রুত পানি না নামলে সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে।”
রাজারহাট উপজেলার গতিয়াশাম এলাকার তিস্তা চরের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “হাঁটুসমান পানির নিচ থেকে ধান কেটে এখন মাড়াই করতে পারছি না। খড় শুকাতে না পারায় পঁচে যাচ্ছে। ভালো ফলন পেলেও ধান ঘরে তুলতে পারব কি না সন্দেহ।”
সদরের চরুয়া পাড়ার বাসিন্দা রমেছা বেগম বলেন, “পানির নিচ থেকে কষ্ট করে ধান কেটে আনা হয়েছে। কিন্তু এখন ধান শুকাতে পারছি না। আর দুই-একদিন বৃষ্টি হলে সব পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে।”

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা হলেও এখনও প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে পাকা ধান রয়ে গেছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এসব জমির ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর কুড়িগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “ভারী বৃষ্টিতে অনেক জমিতে ধানগাছের গলা পর্যন্ত পানি জমে গেছে। এখনও প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে। পানি নেমে গেলে কৃষকরা ধান কাটতে পারবেন। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, “বেশিরভাগ জমির ধান পেকে গেছে। পানি নেমে গেলে সেগুলো কাটা সম্ভব হবে। তবে পানিতে নিমজ্জিত কিছু জমির পাট ও সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
এদিকে রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টায় আরও ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

