১৩ কি ১৪ বছরের এক কিশোরী। চোখে-মুখে তার অনেক স্বপ্ন। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় স্বপ্নের সঙ্গে দায়িত্বটাও যেন বেশ। কিন্তু অভাবের সংসারে থেকে পড়ালেখা করে স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ দরিদ্র বাবা-মায়ের পক্ষে তার পড়ালেখার খরচ জোগান দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ছোট আরো দুই ভাই ও দুই বোন আছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় বাড়ি হওয়ার কারণে অনেকেই কর্মের উদ্দেশ্যে ভারতে যায়-এটা মেয়েটি ছোট থেকেই দেখে আসছে। বাবা-মায়ের অভাবের সংসারের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি এতো অল্প বয়সেই কর্মের উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিজেদের অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে বাবা-মাও তাকে সমর্থন করে। খুব বেশি না, মাত্র কয়েকটা বছর কাজ করে দেশে এলেই পরিবারের অভাব কিছুটা ঘুচবে।
অবশেষে কোনো ধরনের পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই দালালদের মাধ্যমে ভারতের কোচবিহার হয়ে সোজা দিল্লিতে পাড়ি জমায় মেয়েটি। আগেই পাড়ি জমানো দু-একজনের সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে খুব সহজেই কাজের ব্যবস্থা হয় সেখানে।
কখনো ইটভাটার শ্রমিক আবার কখনো বাবুদের কাজের বুয়া হিসেবে বেশ ভালোই কাটছিল। মাইনেও পেতো বেশ।বছর-খানেক থাকার পর এলাকায় তার বিয়ের সম্বন্ধ আসে। মেয়েটিকে জানানো হয় বিয়ের কথা। স্বপ্ন দেখতে শুরু করে মেয়েটি। বিয়ে করে স্বামীকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন।
বাবা নুরুল ইসলাম মেয়েকে আনার জন্য সেই দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই ভারতে ঢোকেন। দিল্লি থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে আসেন কোচবিহারের চৌধুরীহাট সীমান্তে। এলাকাটি বাংলাদেশের ফুলবাড়ি উপজেলার উত্তর অনন্তপুর ও ভারতের দিনহাটা সীমান্তের খিতাবের কুঠি। এই এলাকার ৯৪৭ নাম্বার পিলারের পাশ আসে তারা। কয়েকজন দালালের সহযোগিতায় মই বেয়ে কাঁটাতারের বেড়া পার হন বাবা নুরুল ইসলাম।
তার মেয়ে পার হওয়ার সময় বিএসএফ জোয়ান অমিয় ঘোষের ছোড়া গুলির বিকট আওয়াজ। সেই সঙ্গে গগণবিদারি চিৎকারের শব্দ। কুয়াশাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ প্রকৃতি। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। সবে মাত্র মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাবা নুরুল ইসলাম চিৎকার করতে করতে বাংলাদেশের গ্রামের দিকে আসছেন। গ্রামের মানুষও গুলির শব্দ ও চিৎকারে ততক্ষণে জেগে উঠেছে।
কুয়াশা কেটে সকালের আলো ফুটতে সেদিন অনেক দেরি। সূর্য যখন কুয়াশাকে গ্রাস করে আলো ছড়াতে শুরু করলো, ভয়ার্ত সীমান্তবাসীর চোখে ভেসে উঠল হৃদয়বিদারক সেই ছবি। লাল রঙের সুয়েটার পরা একটি কিশোরী কাঁটাতারের সাথে ঝুলছে। রক্তে রঞ্জিত মেয়েটির জামা যেন আরো বেশি লাল হয়ে উঠেছিল।
ভারতীয় নরঘাতক অমিয় ঘোষের বুলেটের আঘাতে। যে হাতে মেহেদী রাঙানোর স্বপ্ন ছিল, সেই হাত রঞ্জিত হয়ে উঠলো রক্তে।
হতবাক বিশ্ব, কেঁপে উঠল বিশ্ব মানবতা। সৃষ্টি হলো সীমান্ত হত্যার নতুন ও নোংরা ইতিহাস।
আজ দীর্ঘ পনেরো বছর পরও তার হত্যার বিচার হয়নি, মেয়েটির নাম ফেলানী...।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

