আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দিনে প্রশাসনের লোক দেখানো অভিযান, রাতে টপ সয়েল কাটার হিড়িক

উপজেলা প্রতিনিধি, ওসমানীনগর (সিলেট)

দিনে প্রশাসনের লোক দেখানো অভিযান, রাতে টপ সয়েল কাটার হিড়িক

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা ও দায়সারা অভিযানের কারণে ফসলি জমির পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কাটার হিড়িক পড়েছে।

অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় চলতি বছর উদ্বেগজনক হারে কৃষিজমির মাটি কাটা হলেও তা বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। দিনে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাতের আঁধারে নির্বিঘ্নে চলছে টপ সয়েল বাণিজ্য।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলায় অনেক জমির মালিক বিদেশে থাকায় তাদের জমি দেখভাল করেন কেয়ারটেকার বা বর্গাচাষিরা। তারা অনেক সময় ‘ফসল ভালো হচ্ছে না’—এমন অজুহাতে ফসলি জমির দেড় থেকে দুই ফুট গভীর টপ সয়েল মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে সেই মাটি ব্যবসায়ীরা বাড়ি-ঘর, ইটভাটা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভরাট কাজে ব্যবহার করে লাখ টাকায় বিক্রি করেন।

মাটি ব্যবসায়ীদের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা সদরের কয়েকজন পুরোনো মাটি ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিক চক্র উপজেলা প্রশাসনের এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে গত দুই মাস ধরে নির্বিঘ্নে টপ সয়েল কাটার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ বাণিজ্য আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলার তাজপুর, গোয়ালাবাজার, উসমানপুর, দয়ামীর, বুরুঙ্গা, পশ্চিম পৈলনপুর, সাদীপুর ও উমরপুরসহ আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরাঞ্চল থেকে ট্রাক্টর ও ডাম্পারের মাধ্যমে অবাধে কৃষিজমি থেকে টপ সয়েল কাটা হচ্ছে। এতে একদিকে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ট্রাকযোগে মাটি পরিবহনের কারণে উপজেলার বিভিন্ন কাঁচা ও পাকা সড়ক ভেঙে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি সামান্য বৃষ্টিতেই উপজেলার হাওর তীরবর্তী গ্রামের সড়কে পড়ে থাকা মাটি পানির সঙ্গে মিশে কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। এতে রাত থেকে পরদিন পর্যন্ত বিভিন্ন যানবাহনের একাধিক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা শুরু হয়।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার ফলে জমির প্রয়োজনীয় জৈব উপাদান নষ্ট হয়ে উর্বরতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে যেসব ঠিকাদার বা পরিবহন মালিক নির্ধারিত চক্রে টাকা দেননি, তাদের টার্গেট করেই গত সপ্তাহ থেকে উপজেলার কয়েকটি স্থানে পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিচালিত অভিযানে জেল-জরিমানা ও পরিবহন জব্দের ছবি উপজেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেইজে প্রকাশ করে পুরো বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা চলছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।

অথচ রাতের আঁধারে চলমান মাটি কাটার কার্যক্রম বন্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

তাজপুর বাজার এলাকার ভেকু মেশিনের চালক ও মালিক হিরন মিয়া বলেন, “আমি মাটি কাটছি না, শুধু গাড়ি ও ভেকু মেশিন সরবরাহ করছি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাটি ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই মাটি কাটছি। প্রত্যেকে চাঁদা তুলে পুরাতন ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তাদের অফিসের লোক দিয়ে উপরমহলে দিয়েছি।”

গোয়ালাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পীর মজনু মিয়া বলেন, “বর্তমানে অনেকেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে যার যার মতো করে কাজ করে যাচ্ছেন। এতে শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাচ্ছে।”

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মুনমুন নাহার আশা বলেন, মাটি কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযান পর্যাপ্ত নয় এবং পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তোলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন