বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নন-কটন (তুলাবহির্ভূত) পণ্যের অংশ বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৩০.৭ শতাংশ এসেছে নন-কটন পোশাক থেকে। এই নয় মাসে প্রথম নয় মাসে নন-কটন পোশাক রপ্তানি আয় ৯১৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৬৯ শতাংশ এসেছে তুলাভিত্তিক পণ্য থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (এইচএস কোড ৬১ ও ৬২) দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৯.৯১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কটন পোশাক রপ্তানি থেকে এসেছে ২০.৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৬৯.৩ শতাংশ। আর নন-কটন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৯.১৭ বিলিয়ন ডলারের, যা মোট রপ্তানির ৩০.৭ শতাংশ।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরুতে মোট পোশাক রপ্তানিতে তুলাবহির্ভূত পণ্যের অংশ ছিল তুলনামূলক কম। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এ ধরনের পোশাকের হিস্যা ছিল ২৮ শতাংশ। এরপর ধীরে ধীরে এ অংশ বাড়তে থাকে। জুনে প্রথমবারের মতো তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে ৩১.৬ শতাংশে পৌঁছায়।
পরবর্তী মাসগুলোতে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ আরো বাড়ে। আগস্টে মোট পোশাক রপ্তানিতে এ ধরনের পণ্যের হিস্যা সর্বোচ্চ ৩৪.৬ শতাংশে ওঠে। তবে সেপ্টেম্বরে তা কিছুটা কমে ৩২.৬ শতাংশে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, নন-কটন পোশাক রপ্তানি থেকে একক মাসে সর্বোচ্চ আয় এসেছে জুলাইয়ে। ওই মাসে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ১.৩১ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে তুলাবহির্ভূত পণ্যের অবদান উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে প্রথম নয় মাসে মোট রপ্তানির সিংহভাগ—৬৯.৩ শতাংশ—এখনো কটন পোশাক থেকেই এসেছে। তবে বিশ্বের প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে মেলালে এই চিত্র খুব একটা সুখকর নয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৭২.৭ শতাংশই কটননির্ভর, যা, বৈশ্বিক গড়ের (৪১.৬ শতাংশ) প্রায় দ্বিগুণ। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হয়েও এখনো কটননির্ভর রয়ে গেছে বাংলাদেশ। তালিকায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল শুধু পাকিস্তান ও ভারত। এর মধ্যে পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানিতে কটনের অংশ ৮৫.১ ও ভারতের ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনামের কটনভিত্তিক রপ্তানি ৩৪.৮ শতাংশ, চীনের ২৯.৪ এবং কম্বোডিয়ার ৪১.৯ শতাংশ।
জানতে চাইলে পোশাক খাতের ট্রেড ও ইএসজিবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, কটন এখনো বাংলাদেশের পোশাক খাতের মূল ভিত্তি। চলতি বছরের প্রতি মাসে তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১.৯৭ বিলিয়ন থেকে ২.৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ছিল। নন-কটন পোশাকের রপ্তানি বাড়ার কারণেই মোট রপ্তানিতে এ ধরনের পোশাকের হিস্যা বেড়েছে; তুলাভিত্তিক পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে নয়।
সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, ‘বিশ্ববাজারের প্রায় ৭০ ভাগেরই দখল এখন নন-কটন পোশাকের। বাংলাদেশ মাত্র ৩০ শতাংশের আশপাশেই রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের সামনে আরও বিশাল বাজার পড়ে রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। পোশাকশিল্প মালিকরা মনে করেন, কটন থেকে নন-কটনে স্থানান্তরের এই গতিকে আরো বেগবান করতে সরকারের নীতিগত সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নন-কটন রপ্তানির প্রবৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, আমরা গত কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছি নট-কটন, ম্যান মেইড ফাইবার (এমএমএফ) পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে। সে কারণে নিশ্চিতভাবে কিছু কিছু রপ্তানি তো বাড়বেই। এটা তারই একটা প্রতিফলন। কারণ, এমনিতে সারা বিশ্বে কিন্তু আমাদের রপ্তানি বাড়েনি, উল্টো কমেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে গতবারই প্রথম একমাত্র বছর গেছে যে বছরটি শেষে দেখা গেছে মোট পোশাক রপ্তানি কমেছে। এটা আগে কখনো ঘটেনি। তবে সামনের দিনেও নন-কটন, এমএমএফ পণ্য রপ্তানি আরো বাড়বে বলেও মন্তব্য করেন বিকেএমইএর এই নেতা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


