ঋণ ও আমানতের সুদহারের গড় ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নির্দেশনা দেওয়ার দুই মাস পরও নির্ধারিত সীমা মানতে পারেনি দেশের অধিকাংশ ব্যাংক। গত আগস্টে ৫৬টি ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি ছিল। এর মধ্যে বিদেশি খাতের ৯টি ব্যাংকের একটিরও স্প্রেড নির্ধারিত সীমার মধ্যে নেই। ফলে ঋণের সুদহার কমানোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ বাদে ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড ছিল ৫.৫৭ শতাংশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ৫.৩৬ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকের ৫.৫৮ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকের ৪.০২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকের ৮.২০ শতাংশ।
গত জুনে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, অনেক ব্যাংক আমানতের সুদহারের তুলনায় ঋণের সুদহার বেশি নির্ধারণ করছে। এতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বেড়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করছে। উৎপাদনশীল খাতসহ বিভিন্ন খাতে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণ এবং আমানতের গড় ভারিত সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে যেসব ব্যাংকের পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে, সেগুলোরও ঋণ বিতরণ খুব বেশি বাড়ছে না। আগে বিতরণ করা ঋণ ও সংগ্রহ করা আমানতের সুদহারের ব্যবধান দ্রুত কমানো কঠিন হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে অনেক ব্যাংকের স্প্রেড।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের সীমা অতিক্রম
গত আগস্টে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটির স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি ছিল। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের স্প্রেড সর্বোচ্চ ৫.৬৮ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের ৫.২২ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৪.৯২ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ৪.৪২ শতাংশ এবং বেসিক ব্যাংকের ৪.২৭ শতাংশ।
এছাড়া বিশেষায়িত দুই ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের স্প্রেড যথাক্রমে ৪.১৮ ও ৪.৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এ দুই ব্যাংকও নির্ধারিত সীমা মানতে পারেনি।
বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি
বেসরকারি খাতের ৪৩টি ব্যাংকের মধ্যে ৪০টির স্প্রেড নির্ধারিত ৪ শতাংশের বেশি ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের স্প্রেড ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ ৯.৫৩ শতাংশ স্প্রেড গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৮.৮৪ শতাংশ, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৮.৭০ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৮.১৪ শতাংশ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ৭.০৩ শতাংশ।
এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের স্প্রেড ৬.৮২ শতাংশ, এনআরবিসি ব্যাংকের ৬.৮১ শতাংশ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৬.৫১ শতাংশ, কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশের ৬.৩৯ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৬.৩২ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬.৩০ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের ৬.১৪ শতাংশ, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৬.০৭ শতাংশ এবং উত্তরা ব্যাংকের ৬.০৫ শতাংশ।
মাঝারি মাত্রায় বেশি স্প্রেড থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক ৫.৯৩ শতাংশ, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৫.৮৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ৫.৭৮ শতাংশ, মধুমতী ব্যাংক ৫.৭১ শতাংশ, ঢাকা ব্যাংক ৫.৫৭ শতাংশ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ৫.৪৫ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংক ৫.৪৬ শতাংশ, ট্রাস্ট ব্যাংক ৫.৪১ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংক ৫.৩৮ শতাংশ, সাউথইস্ট ব্যাংক ৫.৩৭ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংক ৫.৩৬ শতাংশ এবং আইএফআইসি ব্যাংক ৫.৩১ শতাংশ।
এছাড়া সিটিজেন ও যমুনা ব্যাংকের স্প্রেড ৫.০৫ শতাংশ করে, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৪.৯৪ শতাংশ, ওয়ান ব্যাংকের ৪.৮১ শতাংশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪.৭৬ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৪.৭৪ শতাংশ, সীমান্ত ব্যাংকের ৪.৭১ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৪.৬৭ শতাংশ, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৪.৩২ শতাংশ, মেঘনা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪.২৫ শতাংশ করে স্প্রেড ছিল।
বিদেশি সব ব্যাংকই সীমার বাইরে
বিদেশি খাতের ৯টি ব্যাংকের কোনোটিই বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা মানতে পারেনি। এ খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড সর্বোচ্চ ৯.৭৩ শতাংশ। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার স্প্রেড ৮.৫০ শতাংশ করে। সিটিব্যাংক এনএর ৭.১৫ শতাংশ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৬.৮৬ শতাংশ, উরি ব্যাংকের ৬.৮৫ শতাংশ এবং এইচএসবিসির ৬.৫৫ শতাংশ।
এছাড়া ব্যাংক আল-ফালাহর স্প্রেড ৫.৪১ শতাংশ এবং হাবিব ব্যাংকের ৫.১৬ শতাংশ।
সীমার মধ্যে পাঁচ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ৪ শতাংশ সীমার মধ্যে স্প্রেড রাখতে পেরেছে মাত্র পাঁচটি ব্যাংক। এগুলো হলো এবি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক।
এর মধ্যে এবি ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে কম, ০.৫২ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৩.৯৯ শতাংশ, বিডিবিএলের ১.৮০ শতাংশ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৩.৩৮ শতাংশ এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৩.৮৫ শতাংশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

