ভূমি জটিলতায় থমকে আছে দুই গ্যাস কূপের অনুসন্ধান

ভূমি জটিলতায় থমকে আছে দুই গ্যাস কূপের অনুসন্ধান

দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূমি জটিলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে আছে। জমি অধিগ্রহণ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যেই ডুপিটিলা-১ নম্বর কূপের ভূমি উন্নয়ন ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ শুরু করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের বাধায় সেই কাজ চলছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে কৈলাশটিলা-৯ নম্বর কূপের ভূমি উন্নয়ন ও সংযোগ সড়কের কাজই শুরু করা যায়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি নেই।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সরেজমিন প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে আর্থিক অগ্রগতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ১৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী হালনাগাদ হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। একই সময়ে মূলধন ব্যয়ের অগ্রগতি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

সংস্থাটি বলছে, ভূমি হুকুমদখলের পরিবর্তে অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে দীর্ঘসূত্রতা হয়েছে। সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানোর আগেই কূপ এলাকায় পূর্তকাজ শুরু করা হয়। বিষয়টি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) বাস্তবায়নাধীন ‘ডুপিটিলা-১ ও কৈলাশটিলা-৯ নম্বর কূপ (অনুসন্ধান কূপ) খনন’ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৪১৪ কোটি ৭৮ লাখ এবং এসজিএফএলের নিজস্ব অর্থ ২৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় ডুপিটিলা-১ এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলায় কৈলাশটিলা-৯ নম্বর কূপ খনন এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানায়, ডুপিটিলা কাঠামোয় প্রায় ৩,৪৫০ মিটার এবং কৈলাশটিলায় প্রায় ৩,৬০০ মিটার গভীরতায় অনুসন্ধান চালানো হবে। নতুন কূপ খননে গ্যাস পাওয়া গেলে ডুপিটিলা-১ ও কৈলাশটিলা-৯ নম্বর কূপ দুটি থেকে প্রথম পাঁচ বছরে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে এবং পরবর্তী পাঁচ বছরে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট হারে অর্থাৎ ১০ বছরে মোট ৫৬ বিসিএফ গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার আংশিক পূরণ করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পের শুরু থেকেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ভূমি। ডিপিপিতে কূপ দুটির জন্য ভূমি হুকুমদখলের বিধান রাখা হয়েছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে ডুপিটিলা-১ কূপের জমির মালিকদের আপত্তির মুখে প্রক্রিয়াটি আটকে যায়। একই বছরের নভেম্বরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিস জারি হলেও ভূমির মালিকরা তা গ্রহণে আপত্তি জানান।

পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন হুকুমদখলের পরিবর্তে জমি অধিগ্রহণের পক্ষে মত দেয়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় দুই কূপের জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্তের পরও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় গতি আসেনি। প্রায় ৯ মাস পর ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংশোধিত প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।

আইএমইডির আপত্তির জায়গাটি এখানেই। জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের আগেই কূপ এলাকায় পূর্তকাজ শুরু করা হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।

ডুপিটিলা-১ কূপের ৭৮৩ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে ৬০ মিটার সেতুসহ ২৩২ মিটার নির্মাণ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ৫৫১ মিটারে সেতু ও বড় কালভার্টসহ কাজ চলছে। কূপ সাইটে বালু ভরাটও অব্যাহত রয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় স্থানীয়দের বাধার কারণে নির্মাণকাজের গতি কমেছে। কৈলাশটিলা-৯ নম্বর কূপের ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়ন কিংবা সংযোগ সড়ক তৈরির কাজ এখনো শুরু হয়নি।

ডুপিটিলা-১ কূপের জমি অধিগ্রহণেও নতুন পরিবর্তন এসেছে। কূপে যাওয়ার পথে বিদ্যমান একটি সেতু কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা সম্ভব নয় বলে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন। এ কারণে আগের ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাব বাতিল করে ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল সংশোধিত প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়। পরে ৩ আগস্ট জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কৈলাশটিলা-৯ কূপের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ জেলা প্রশাসনের প্রাক্কলিত অর্থ এসজিএফএলের পরিচালন বাজেট থেকে ২ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বড় অঙ্কের অর্থে খননকাজের চুক্তি হলেও মাঠপর্যায়ে মূল কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ডিপিপিতে খনন অপারেশন, মালামাল, প্রকৌশল ও পূর্তকাজসহ এ খাতে ৫২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৪৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।

প্রকল্পের আওতায় গ্যাস পাওয়া গেলে গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ, নিরাপত্তা স্থাপনা, ড্রেন, সীমানাপ্রাচীরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধান কূপ খননের পূর্বশর্ত ভূমি ও সংযোগ অবকাঠামোর কাজই পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় মূল খনন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আইএমইডি প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে নিয়মিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভা আয়োজনের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি প্রতি মাসে বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন আইএমইডি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং পেট্রোবাংলায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে নির্মাণকাজের সঙ্গে খনন কার্যক্রম সমন্বয় করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নেওয়া এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন হলে জাতীয় গ্রিডে নতুন সরবরাহ যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণকাজ এবং সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই অনুসন্ধান কূপের কাজ শেষ করাই এখন এসজিএফএলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন