বড় ধরনের আর্থিক ও কাঠামোগত সংকটের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি। উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, বিশাল সঞ্চিতি ঘাটতি এবং চলতি বছরের প্রথমার্ধে বড় অংকের নিট লোকসান ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতাকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। তবে ব্যাংকের বিশাল আমানত ও শক্তিশালী তারল্যের যে ভিত্তি রয়েছে, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড়াতে সুনির্দিষ্ট ৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।
এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছেÑহিসাব সমন্বয়ের পরিবর্তে প্রকৃত নগদ আদায় বৃদ্ধি, উচ্চ ব্যয়ের আমানত কমানো, ডিজিটাল সেবাকে দক্ষতায় রূপান্তর এবং সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে সম্প্রতি পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় রূপালী ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থা, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন, মুনাফা, তারল্য, সুশাসন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ব্যাংকটিকে এসব নির্দেশনা প্রদান করা হয় বলে সভার কার্যবিবরণী ঘেঁটে এ তথ্য জানা গেছে।
সভায় জানানো হয়, চলতি বছরের জুলাই মাস শেষে রূপালী ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে সার্বিক খেলাপি ঋণের হার ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ হওয়ায় দুই হিসাবের ব্যবধান প্রায় ১৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ব্যাংকটিতে যুক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ১৪ কোটি টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি, ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি, ১ দশমিক ৭০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততার হার এবং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬৪৩ কোটি টাকার নিট লোকসান। জুলাইয়ে ব্যাংকের মোট সম্পদ প্রায় ৮৬ হাজার ৫৯০ কোটি, আমানত ৭২ হাজার ৪০৫ কোটি এবং ঋণ ও অগ্রিম ৫২ হাজার ১৫৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্পদ বাড়ানোর চেয়ে ঋণের মান ঠিক করাকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এছাড়া নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের নগদ অর্থপ্রবাহ, পরিশোধক্ষমতা, গোষ্ঠীঋণ, প্রকৃত মালিকানা এবং খাতভিত্তিক ঝুঁকি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
সভায় আরো জানানো হয়, ব্যাংকের ৮২ লাখ ২৫ হাজার আমানত হিসাব থাকলেও কম বা বিনা খরচের আমানতের অংশ কমে ৪১ শতাংশে নেমেছে এবং তহবিলের গড় ব্যয় বেড়ে ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার কম খরচের আমানত তুলে নেওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ। এ কারণে চলতি ও সঞ্চয়ী, বেতনভিত্তিক, প্রবাসী আয়-সংযুক্ত ও ডিজিটাল হিসাব বাড়িয়ে স্থিতিশীল কম খরচের আমানত বাড়াতে এবং বড় প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঋণ-আমানত অনুপাত প্রায় ৭২ শতাংশ হলেও আগ্রাসী ঋণ বিতরণ কোনো সমাধান নয় বলে সভায় মতপ্রকাশ করা হয়। মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশ শিল্প খাতে এবং শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে বড় অঙ্কের অর্থ কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বড় করপোরেট ঋণের এই কেন্দ্রীভবন কমিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি, নারী উদ্যোক্তা এবং উৎপাদনশীল খাতে মানসম্মত ঋণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে নামানোর কথা জানায়। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু হিসাব সমন্বয় বা সাময়িক পুনঃতফসিলের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত নগদ আদায় এবং সামগ্রিক প্রভাব আলাদাভাবে মূল্যায়ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে সভায়।
আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে ব্যাংকের আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনে ৫টি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সম্পদের মান উন্নয়ন; মূলধন ও সঞ্চিতি পুনর্গঠন; মুনাফা পুনরুদ্ধার; ঋণভাণ্ডারে ভারসাম্য এবং সুশাসন ও ডিজিটাল রূপান্তর। প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সময়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
রূপালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহেদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার আলোকে ইতিমধ্যে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

