ব্যাংক খাতে ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা লোকসান

রোহান রাজিব

ব্যাংক খাতে ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা লোকসান

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামগ্রিকভাবে লোকসানে পড়েছে দেশের ব্যাংক খাত। গত বছর রেকর্ড খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার সিংহভাগই প্রভিশন সামলাতে চলে গেছে, যা সামগ্রিক ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ঋণাত্মকে পরিণত হয়।

গত বছর ব্যাংক খাতে সম্মিলিত নিট লোকসান হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর আগে কখনো সম্মিলিতভাবে লোকসানের মুখে পড়েনি দেশের ব্যাংক খাত।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের মোট সুদ আয় ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় আট দশমিক এক শতাংশ কম। অন্যদিকে সুদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। ফলে সুদ থেকে আয় ঋণাত্মক হয়ে ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা লোকসানে নেমে আসে।

তবে সুদের বাইরের আয় বা বিনিয়োগ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এতে মোট আয় দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা।

এ সময় ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে ৫১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা হয়েছে। ফলে প্রভিশন সংরক্ষণের আগে ব্যাংক খাতের মুনাফা ছিল ১৯ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা; কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের পরিমাণ এক লাফে বেড়ে এক লাখ ৪৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ছয়গুণ বেশি। ফলে কর-পূর্ব লোকসান দাঁড়ায় এক লাখ ২৪ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। কর বাবদ ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা ব্যয় যোগ হওয়ার পর ব্যাংক খাতের নিট লোকসান বেড়ে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়। দেশের ব্যাংক খাতের সম্মিলিত নিট মুনাফা গত বছরেই লোকসান হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সম্মিলিত নিট মুনাফা হয় ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা এক লাখ ৪৮ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা কমে গেছে, যা এক হাজার ২২৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি।

যদিও ২০২৩ সালে সম্মিলিত নিট মুনাফা হয় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ২০২২ সালে সম্মিলিত নিট মুনাফা হয়েছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করায় ব্যাংকগুলোকে বিপুল অঙ্কের প্রভিশন রাখতে হয়েছে। ফলে পরিচালন কার্যক্রমে মুনাফা থাকলেও প্রভিশনের চাপ সামলাতে গিয়ে পুরো ব্যাংক খাতই লোকসানে পড়ে গেছে। ব্যাংক খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে খেলাপি ঋণ আদায় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অধিকাংশ ব্যাংক লোকসানে

গত বছর অধিকাংশ ব্যাংক লোকসানের মুখে পড়েছে, যার প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিট লোকসান ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩১ হাজার কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের চার হাজার ৬৮৫ কোটি, জনতা ব্যাংকের তিন হাজার ৮২০ কোটি, এবি ব্যাংকের তিন হাজার ৭০৬ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের দুই হাজার ৪৩০ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের দুই হাজার ৫৬১ কোটি, পদ্মা ব্যাংকের ৯৩০ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯৯২ কোটি টাকা।

যেসব ব্যাংক ভালো করেছে

কিছু ব্যাংক বড় লোকসান করলেও আবার কয়েকটি মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংক তো রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক তিন হাজার ২১৯ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক এক হাজার ৫৮০ কোটি, সিটি ব্যাংক এক হাজার ৩০৫ কোটি, সোনালী ব্যাংক এক হাজার ২৪১ কোটি, পূবালী ব্যাংক এক হাজার ৭৯ কোটি, ডাচ্-বাংলা ৯৩৪ কোটি, প্রাইম ব্যাংক ৮৯০ কোটি, এইচএসবিসি ৮৩৮ কোটি, যমুনা ব্যাংক ৫৫৭ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৩৬৭ কোটি এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৩২৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এভাবে যদি একটি খাতের ৬০ শতাংশ ঋণ বা সম্পদ ‘স্ট্রেসড’ (ঝুঁকিপূর্ণ) অবস্থায় থাকে, তবে সামগ্রিক ব্যাংক খাত লোকসানে পড়াই স্বাভাবিক। দেশের ব্যাংক খাতের প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা এখন স্ট্রেসড অ্যাসেট হিসেবে আটকে আছে, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল এবং অবলোপন করা ঋণ অন্তর্ভুক্ত।

আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপির হার ৩৫ শতাংশ। তবে সেখানে আয়ের কোনো সুযোগ থাকে না। ইন্টারেস্ট ইনকাম আটকে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো আয় দেখাতে পারছে না। দুবছর যাবৎ ঋণ পরিশোধ করা লাগবে না—এমন সুযোগ দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এর প্রভাবে চলতি বছর পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে এবং আগামীতেও এ সংকটের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটি ব্যাংক বড় আকারে ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার প্রভাব পুরো খাতেই পড়েছে। তবে এসব ব্যাংক ছাড়া অনেকগুলো আবার ভালো মুনাফাও করেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন