সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি জমায় বুধবার থেকে ‘এ-চালান’ বাধ্যতামূলক

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি জমায় বুধবার থেকে ‘এ-চালান’ বাধ্যতামূলক

সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য সব ধরনের প্রাপ্তি জমার ক্ষেত্রে বুধবার থেকে এ-চালান ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং অধীনস্থ দপ্তরকে এই পদ্ধতিতেই সরকারি অর্থ সংগ্রহ ও জমা দিতে হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ম্যানুয়াল চালান ব্যবস্থারও আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটছে।

মঙ্গলবার অর্থ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সরকারি অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা নিশ্চিত করা, নগদ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা, আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে এ-চালানের বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব বা অন্যান্য প্রাপ্তি সংগ্রহ কিংবা জমা দেওয়া যাবে না। বর্তমানে সরকারি অর্থ গ্রহণে ব্যবহৃত পৃথক কোনো ব্যবস্থা থাকলে তা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে সংরক্ষিত সরকারি অর্থ ৩০ জুনের মধ্যে এ-চালানের মাধ্যমে সরকারের ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ-চালান ব্যবস্থার ধারাবাহিক সম্প্রসারণ এবং এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এ প্ল্যাটফর্মের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ২২৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ৬ কোটি ৭৫ লাখ চালান প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে। এ সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি চালান দিয়ে যাত্রা শুরু করা এ-চালান প্লাটফর্ম গত সাত অর্থবছরে ১৯ কোটি ৩ লাখের বেশি চালান প্রক্রিয়াকরণ করেছে। এ সময়ে সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে ১০ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

অনলাইনভিত্তিক লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অনলাইন চালানের সংখ্যা ৯২ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখে পৌঁছেছে। অনলাইনে আদায়ের পরিমাণ ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৯৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। একই সময়ে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, এ-চালান পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের প্রকৃত নগদ অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ছড়িয়ে থাকা অলস সরকারি অর্থ কমবে এবং নগদ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হবে।

এ ব্যবস্থার ফলে সরকারি ফি ও রাজস্ব জমা দিতে নির্দিষ্ট ব্যাংক শাখায় যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে। অর্থ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানের রসিদ তৈরি হয় এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। এতে নাগরিকদের সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সব তফসিলি ব্যাংকের শাখা কাউন্টার ছাড়াও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়, ট্যাপসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ও সেবা ফি জমা দেওয়া যাচ্ছে।

অর্থ বিভাগ আরও জানায়, এ-চালানের মাধ্যমে জমা হওয়া অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়। ফলে সরকারি প্রাপ্তির তথ্য রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত হচ্ছে। এ-চালান ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব আদায় ও লেনদেনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারছে। চালান যাচাই ব্যবস্থার কারণে যে কোনো চালানের সত্যতা দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হওয়ায় ভুয়া চালান, জাল দলিল এবং রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বৃহত্তর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অংশ হিসেবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ-চালান ব্যবস্থা চালু করে অর্থ বিভাগ। সরকারি অর্থ দ্রুত কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, ভুয়া চালান প্রতিরোধ এবং সরকারের নগদ অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...