ইসলামী ব্যাংককে এক সপ্তাহে দেওয়া হলো ৯ হাজার কোটি টাকা

টাকা ছাপিয়ে ফের ধার দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

রোহান রাজিব

টাকা ছাপিয়ে ফের ধার দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
ফাইল ছবি

টাকা ছাপিয়ে আবারও বাণিজ্যিক ব্যাংককে তারল্য সহায়তা বা ধার দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবশেষ গত এক সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ অর্থ নতুন টাকা ছাপানোর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। এর আগে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) বজায় রাখতেও ব্যর্থ হয় এবং গ্রাহকদের চাহিদামতো নগদ অর্থ পরিশোধে সংকটে পড়ে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হলে ধাপে ধাপে ব্যাংকটিকে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নতুন টাকা সৃষ্টি করে কোনো ব্যাংককে ঋণ দেয়, তখন তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়ে। উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে একটি ব্যাংককে সীমিত পরিসরে দেওয়া তারল্য সহায়তার প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে খুব বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌকিফ আহমেদ বলেন, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠাই এ সহায়তার মূল উদ্দেশ্য। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংককে দেওয়া এ ধরনের সহায়তার কারণে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে না।

তিনি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়লে চাহিদাও কিছুটা বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে একটি ব্যাংককে সীমিত পরিসরে দেওয়া তারল্য সহায়তার কারণে বাস্তবে এর প্রভাব সাধারণত খুবই সামান্য থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ বা শেষ আশ্রয়দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালনেরই অংশ। কোনো ব্যাংক হঠাৎ তারল্য সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো সাময়িক সহায়তা দেওয়া, যাতে ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, এটি কোনো অনুদান নয়; বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ঋণ, যা নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করতে হবে। ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। এমন একটি ব্যাংক কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলে পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বৃহত্তর আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

মোস্তফা কে. মুজেরী আরো বলেন, ব্যাংকটির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একজন নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এই সহায়তার কারণে মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন কোনো ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়, তখন নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করে। এই অর্থের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে সমপরিমাণ পণ্য বা সেবা না থাকলে তাত্ত্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এ ধরনের সহায়তায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা উসকে দেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। বিশ্বের কোনো ব্যাংকের পক্ষেই সব গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা অপরিহার্যতার নীতির ভিত্তিতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

তিনি বলেন, এই সংকট সাময়িক। ইসলামী ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে আসবে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হবে না।

আগেও টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশের পর এসব ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলন বাড়তে থাকে। তখন ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকরা অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন। এতে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলো সিআরআর ও সরকারি সিকিউরিটিজ হিসেবে এসএলআর রাখতেও ব্যর্থ হয়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়।

এরপর সংকট আরো গভীর হলে তখন ব্যাংকগুলোর চলতি হিসাব ঘাটতিতে পড়ে। সে ঘাটতি রেখেও লেনদনের সুযোগ দেন তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়। শুরুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে অর্থ সহায়তা না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকে তারল্য সংকট ও অস্থিরতা বাড়তে থাকায় পরে আবার বিশেষ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমান সরকারও টাকা ছাপিয়ে ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিল। তবে ইসলামী ব্যাংকে সাম্প্রতিক সংকটের কারণে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ তারল্য সহায়তা দিতে বাধ্য হয়।

কোন ব্যাংক কত সহায়তা পেয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিশেষ তারল্য সহায়তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক ৯ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে।

এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক পাঁচ হাজার ৪২০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পাঁচ হাজার কোটি, এবি ব্যাংক চার হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক তিন হাজার তিন কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৬২৪ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংক ২৫২ কোটি এবং বেসিক ব্যাংক ১৯৫ কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। সব মিলিয়ে বিশেষ তারল্য সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

যেভাবে দেওয়া হয় ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ও ১৭(১)(বি) ধারার আওতায় ৯০ দিনের জন্য সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই অর্থ দেওয়া হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় এটি ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা নামে পরিচিত। ঋণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সমমূল্যের ডিমান্ড প্রমিসরি নোট জমা দেয়। শর্তানুযায়ী, কোনো ব্যাংক অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে তাদের সম্পদ বিক্রির অর্থ থেকে সবার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন