সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর দীর্ঘদিনের পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত সংকট কাটাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি। শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) অবিলম্বে শতভাগ কার্যক্ষম করা এবং চামড়া খাতের বহুমুখী সংকট সমাধানে একটি স্পষ্ট ও যুগোপযোগী রোডম্যাপ তৈরির সুপারিশ করেছে কমিটি।
সাম্প্রতিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন মাহবুব, এমপির সভাপতিত্বে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কমিটির সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, আবুল হোসেন খান, আবুল কালাম, হেলেন জেরিন খান, হামিদুর রহমান, মোহাম্মাদ কামাল হোসেন, গাজী এনামুল হক, আব্দুল মুনতাকিমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, বৈঠকে বিগত সরকারের আমলের চামড়া শিল্পের ক্ষতি, ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে কমিটির সদস্য গাজী এনামুল হক উল্লেখ করেন, পর্যাপ্ত চামড়ার সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত দাম না পাওয়া এবং সঠিক প্রসেসিংয়ের অভাবে খাতটি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছে।
বিশেষ টাস্কফোর্স ও সিইটিপির বর্তমান অবস্থা
বৈঠকে বাণিজ্য সচিব জানান, চামড়া শিল্পের উন্নয়নে বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একাধিক মন্ত্রী ও ১০টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর জানান, সাভারের সিইটিপি পুরোপুরি অকার্যকর নয়; তবে এর ধারণক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার থেকে কমে ১৪-১৫ হাজার ঘনমিটারে নেমে এসেছে এবং এর মূল সমস্যা হলো ক্রোমিয়াম রিকভারি ব্যবস্থার অভাব। এটি সংস্কারের জন্য ইতালীয় একটি কোম্পানির মাধ্যমে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা হয়েছে।
বড় কারখানাগুলোর বকেয়া ও ছোটদের সাফল্য
বৈঠকে আলোচনা হয় যে, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে বড় বড় প্লট পাওয়া অনেক কারখানা গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও বিসিকের বিল বকেয়া রেখে উৎপাদন বন্ধ রাখলেও তুলনামূলক ছোট কারখানাগুলো নিয়মিত বিল পরিশোধ করে নিয়মিত পণ্য রপ্তানি করে যাচ্ছে। এছাড়া যারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম, তাদের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে ‘এলডাব্লিউজি গোল্ড সার্টিফাইড’ করা হবে এবং অপারগ ট্যানারিগুলোর জন্য একটি ‘গ্রেসফুল এক্সিট’ বা প্রস্থান সুযোগ তৈরি করা হবে।
সুনির্দিষ্ট টাইমলাইনের তাগিদ
কমিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন মাহবুব সভায় জানান, চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসন এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি স্পষ্ট টাইমলাইন বা সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে; অথচ চামড়ার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। এমতাবস্থায়, ২০২৭ বা ২০২৮ সাল—ঠিক কবে নাগাদ এই সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান অর্জিত হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) আগামী সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আবশ্যিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
অন্যদিকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি), ক্রোম রিকভারি ইউনিট (সিআরইউ) স্থাপন কিংবা প্রযোজ্য পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্লট মালিকদের জন্য সম্মানজনকভাবে শিল্পনগরী ছাড়ার পরিকল্পনা বা ‘এক্সিট প্ল্যান’প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ এবং অন্যান্য পরিবেশগত শর্ত অনুসরণের ভিত্তিতে প্লট পরিচালনা সংক্রান্ত বিধিবিধান চূড়ান্ত করা হবে। এরপরও যেসব প্লট মালিক নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাদের জন্য এক্সিট প্ল্যান তৈরি করা হবে।
জানা গেছে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর ১৯টি ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপনে আগ্রহী। ইটিপি ও ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট— দুটিই স্থাপনে আগ্রহী ১৫টি ট্যানারি। শুধু ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট স্থাপন করতে চায় ১০টি ট্যানারি। অন্যদিকে ১১টি ট্যানারি ইটিপি বা ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট— কোনোটিই স্থাপনে আগ্রহী নয়। এসব ট্যানারির প্রতিটির প্লটের আয়তন ৫০ হাজার বর্গফুটের বেশি।
জানা গেছে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরজনিত ঋণ ও সুদের চাপ, চলতি মূলধনের সংকট, নিজস্ব ইটিপি স্থাপনে অর্থায়নের সমস্যা, সবুজ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা এবং হাজারীবাগের জমিসংক্রান্ত জটিলতা চামড়াশিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব কারণে শিল্পটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে।
খালি প্লট বরাদ্দের উদ্যোগ
এছাড়াও চামড়া শিল্পনগরীতে উৎপাদিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রহী শিল্পমালিকদের শিল্পনগরীর ভেতরে খালি প্লট বরাদ্দের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরির সুযোগ পরীক্ষা করবে বিসিক ও বিটিএ। পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়, এমন কঠিন বর্জ্য নিরাপদে অপসারণের জন্য ল্যান্ডফিল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

