বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গভীর ও জটিল কাঠামোগত ফাঁদের মধ্যে আটক আছে বলে জানিয়েছেন । এই কাঠামোগত ফাঁদের মূল তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক কষ্ট, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা। এটি কোনো সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি গভীরে প্রোথিত সমস্যা।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর ও জটিল কাঠামোগত ফাঁদে আটকে রয়েছে। এ সংকটের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে—পরিবার পর্যায়ে অর্থনৈতিক চাপ ও ভোগান্তি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা। তিনি বলেন, এটি কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক সংকট নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পিপিআরসি আয়োজিত' স্টেট অব দ্য রিয়াল ইকোনমি' বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
এসময় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, কাঠামোগত ফাঁদের প্রথম বৈশিষ্ট্যটি হলো পরিবার পর্যায়ে অর্থনৈতিক কষ্ট প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়া। পূর্বে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে অতিদারিদ্র্য ও মাঝারি দারিদ্র্যের হার উদ্বেগজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। কেবল আয় ও ব্যয়ের তথ্য দিয়ে এই সংকটের বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ থাকলেও সেখানে চাকরির কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা নেই এবং পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে ছদ্ম বেকারত্ব বা আংশিক কর্মসংস্থান একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের অতিরিক্ত খরচ পরিবারগুলোর জন্য বড় আর্থিক বোঝা তৈরি করছে, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি পরিবারে অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত এবং তারা প্রতিনিয়ত চিকিৎসার খরচের ধাক্কা সামলাচ্ছেন।
জিল্লুর রহমান বলেন, পরিবার পর্যায়ে সঞ্চয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা শতকরা ৪৪ ভাগের চেয়েও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানুষের ঋণের সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। পরিবার পর্যায়ের এই অর্থনৈতিক কষ্টকে অর্থনীতির এক অনু বা ক্ষুদ্র বাস্তবচিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।অর্থনৈতিক ফাঁদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী গতি। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে পরিবার পর্যায়ে অর্থনৈতিক কষ্ট থাকলেও সেখানে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী থাকে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন; এখানে পরিবার পর্যায়ের কষ্টের পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির ও নিম্নমুখী এবং প্রবৃদ্ধির প্রকৃতিও নিম্নমুখী। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মূল্যায়নেও বিনিয়োগের এই স্থবিরতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
কাঠামোগত ফাঁদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা বা রাজনৈতিক অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে প্রধান তিনটি ক্ষেত্রে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো হলো—পরিবার পর্যায়ের আর্থিক কষ্টের উপশম করা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনা এবং তা বাস্তবায়নে উপযুক্ত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি পরিবার পর্যায়, মাঝারি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র এবং রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার ফাঁদে আটকে রয়েছে। এই কাঠামোগত ফাঁদ থেকে উত্তরণ পেতে হলে প্রথমত স্বীকার করে নিতে হবে,অর্থনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে বন্দি, যা কেবল কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক দুরবস্থা নয়।
তিনি পরামর্শ দেন, কেবল একটি ব্যাংক কমিশন গঠন করা বা নতুন কোনো নীতি প্রতিবেদন তৈরি করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সমাজ, সরকার ও অর্থনীতির সমন্বয়ে একটি সর্বাত্মক উত্তরণমূলক রূপরেখা তৈরি করে সংস্কার করা জরুরি।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এককভাবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সংকেত।
তিনি বলেন, গত দুই দশক ধরে চামড়া, ওষুধ ও আইটি খাতকে পোশাক খাতের বিকল্প প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে আশাবাদ শোনানো হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ব্যবসা-বাণিজ্য শুরুর সময় মোট রপ্তানিতে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ৭৩ থেকে ৭৫ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে ৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। পোশাক খাত ছাড়া অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোর কোনো লক্ষণীয় উন্নতি না হওয়া এবং এক্সপোর্ট শেয়ার একমুখী হয়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেন নীতি সহায়তা দেওয়ার পরও অন্য খাতগুলো শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারছে না—তা নিয়ে গভীর ও সুনির্দিষ্ট গবেষণার প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে সার্টিফিকেটভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে দক্ষতামূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। সরকারের টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের বিশাল পরিসংখ্যানকে ‘নম্বর গেম’ বা সংখ্যার খেলা। প্রতি বছর কত লাখ শিক্ষার্থী ট্রেনিং পাচ্ছে সেই সংখ্যা দেখানো হলেও, কতজন শিক্ষার্থী বাস্তবে কর্মসংস্থানে প্রবেশ করছে তার কোনো সঠিক মূল্যায়ন বা তথ্য সরকারের পরিসংখ্যানে নেই।
ফজলুল হক বলেন, বর্তমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতির ফাইল চলাচলের কারণে তরুণ প্রজন্ম ব্যবসায়িক বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে। পুরোনো জেনারেশন অফিসে ঘুরে কাজ করতে অভ্যস্ত থাকলেও, নতুন জেনারেশন প্রযুক্তিনির্ভর ‘ওয়ান-বাটন সার্ভিস’ প্রত্যাশা করে। স্টার্টআপ সংস্কৃতি এই আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাইপাস করে গড়ে উঠলেও, সরকারি দপ্তরের হয়রানি বজায় থাকলে দেশে দীর্ঘমেয়াদে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

