বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় বাধা সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব

বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় বাধা সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথে বড় বাধা সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। তবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর নীতিমালা ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব। আমার দেশকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম এসব কথা জানান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইসমাঈল হোসাইন সোহেল।

বিজ্ঞাপন

আমার দেশ : আপনাকে স্বাগতম।

খোরশেদ আলম : ধন্যবাদ।

আমার দেশ : সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিসিসিসিআইকে আরো গতিশীল করতে আপনার প্রাথমিক অগ্রাধিকারগুলো কী?

খোরশেদ আলম : গত বছরের অক্টোবরে আমি এখানে দায়িত্ব গ্রহণ করি। এর আগে আমি এই চেম্বারের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলাম। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরই আমি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি বিসিসিসিআই প্রতিনিধিদের নিয়ে। আমাদের দেশে উন্নয়নের জন্য চীনের কী ধরনের সহযোগিতা লাগবে, সে বিষয়ে ছয়টি দাবি তুলে ধরি। আমার ভিশন হলো এই ছয়টি কাজ আগে করা।

আমার দেশ : অগ্রাধিকারের সেই ছয়টি বিষয় কী?

খোরশেদ আলম : এক নম্বর হলো বাংলাদেশে চীন থেকে অনেক কিছু আমদানি হয়। আমরাও বড় ধরনের একটি অংশ রপ্তানি করি। তাদের সঙ্গে আমাদের একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির জন্য এখানে চীনের কোনো ব্যাংক নেই। যেখানে শ্রীলঙ্কার মতো দেশেরও একটি ব্যাংক আছে। এখন চীন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ; তাদের একটি ব্যাংক আমাদের দেশেও দরকার। আমরা বলেছি, তোমাদের একটি ব্যাংক এখানে খোলার ব্যবস্থা করে দাও, এতে আমরা সরাসরি চাইনিজ কারেন্সিতেও তোমাদের পে করে কাঁচামাল আনতে পারব। আমরা তোমাদের কাছে যেটা রপ্তানি করি, সে টাকাও কাজে লাগাতে পারব। এতে আমাদের খরচ কম হবে; পাশাপাশি আমাদের ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ও বাড়বে।

দুই নম্বরে আমি ম্যানমেইড ফাইবারের (এমএমএফ) কারখানা স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছি। কারণ, বর্তমান বিশ্বে এমএমএফের বেশ প্রচলন হয়েছে। আমরা যেটা বানাচ্ছি, সেটা হলো কাঁচামাল এনে তারপর বানাচ্ছি। আমরা বলেছি, এখানে একটি এমএমএফ ইন্ডাস্ট্রি তারা যেন স্থাপন করে বা জয়েন্ট ভেঞ্চারে বিনিয়োগ করে। তৃতীয়ত, আমাদের পুঁজিবাজারে এখন চীনের বিনিয়োগ দরকার। আমাদের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা বেশি ভালো নয়; এখানে যদি তোমরা ইনভেস্ট কর, তবে ভবিষ্যতে তোমরা খুব ভালো লাভ করতে পারবে।

চার নম্বরে বলেছি, আমাদের এখানে ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ চাচ্ছি। পঞ্চম হলো, চীনে রপ্তানি বাড়াতে তাদের বিভিন্ন শহরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ফ্রি অব কস্টে দেওয়ার কথা বলেছি, যাতে সে দেশের মানুষ আমাদের পণ্য সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। সবশেষ দাবি ছিলÑচীনের উদ্যোগে বাংলাদেশে ২০টি পলিটেকনিক স্কুল করে এখানকার ছেলেমেয়েদের হাতে-কলমে প্রযুক্তি শিক্ষা দেওয়া।

আমার দেশ : চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে আপনার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ কী?

খোরশেদ আলম : চীন বাংলাদেশে ১৭ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করে। অন্যদিকে আমরা ৭৮০ মিলিয়ন ডলার মাত্র রপ্তানি করছি। এই গ্যাপটি পূরণ করার জন্য আমাদের চীনের সঙ্গে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এর জন্য সর্বপ্রথম একটি অন্যতম পদক্ষেপ হতে পারে চীনের বিভিন্ন শহরে আমাদের পণ্য প্রদর্শনী বা বিক্রির জন্য ২০টি আউটলেটের অনুমতি পাওয়া। এর জন্য আমাদের কোনো টাকা দিতে হবে না। এখানে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় সব ধরনের পণ্য থাকবে। আমরা ছয় মাস ওখানে পর্যবেক্ষণ করব যে, আমাদের কোন পণ্যটি তারা চাচ্ছে। আমাদের দেশে কী কী পণ্য হয়, কারা কারা এখানে বিনিয়োগ করতে চায়Ñএ ধরনের সহযোগিতার জন্য আমাদের চায়না চেম্বারের একটি ছোট কাউন্টার থাকবে। এটা আমার একটি ভিশন। আমি এটা করব।

আমার দেশ : আপনাদের প্রস্তাবের বিপরীতে এখন পর্যন্ত চীনের পক্ষ থেকে কী ধরনের সাড়া পেয়েছেন?

খোরশেদ আলম : সবশেষ তথ্য হলোÑচীন আমাদের বিনা ভাড়ায় কুনমিংয়ে ২০০০ বর্গমিটারের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টল দিতে রাজি হয়েছে। এর পাশে আরো ২০০০ মিটারের একটি গুদাম দেওয়ার কথাও আমরা বলেছি। তারা এ নিয়ে সরকারিভাবে ইপিবির সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আমরা মনে করি, এটি আমাদের বিরাট পাওয়া।

আমার দেশ : বিদেশি বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে? এগুলো থেকে উত্তরণে আপনার পরামর্শ কী?

খোরশেদ আলম : বর্তমানে আমাদের যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, এসব বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা কম। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখনো প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে। আমার মতে, এটিই বিদেশি বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা। এ কারণে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগকারীরা আসেননি। ধরুন, আপনি চট্টগ্রাম বা ঢাকার কোথাও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলবেন। প্রথমেই আপনাকে ঠিক করতে হবে সেখানে কী ধরনের শিল্প স্থাপন করবেন—চামড়া, গার্মেন্টস, সিরামিক নাকি টেক্সটাইল। এরপর একটি কারখানা স্থাপনে ন্যূনতম কত বিঘা জমি প্রয়োজন এবং একজন বিনিয়োগকারীকে কতটুকু জমি দেওয়া হবে, তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। টেক্সটাইল শিল্পের জন্য একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করতে হবে। এতে প্রতিটি কারখানাকে আলাদাভাবে ইটিপি স্থাপন করতে হবে না। কারখানাগুলোর বর্জ্যপানি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় শোধন করে পুনঃব্যবহারের উপযোগী করা যাবে। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে একটি ছোট টার্মিনাল থাকতে হবে। কাঁচামাল আনা বা পণ্য সরবরাহের সময় প্রতিটি কারখানার দরজায় ট্রাক নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য উঠানো-নামানোর ব্যবস্থা থাকবে।

তৃতীয়ত, সেখানে ফর্কলিফটসহ প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন সুবিধা থাকতে হবে। প্রতিটি কারখানাকে আলাদাভাবে এসব সরঞ্জাম কিনতে হবে না। এ ছাড়া একটি ফায়ার স্টেশনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেবার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব সুবিধা কেন্দ্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলোর ব্যয় কমবে।

একইভাবে ডাইং কারখানার জন্য আলাদা আলাদা বয়লার স্থাপনের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় বয়লারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে প্রতিটি কারখানাকে আলাদাভাবে বয়লার কিনতে হবে না। ফলে ব্যয়, গ্যাসের অপচয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে। এ ধরনের একটি শিল্পাঞ্চল সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হলে ছয় মাসের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা প্লট নিতে পারেন এবং দুবছরের মধ্যে শিল্পকারখানাগুলো উৎপাদনে যেতে পারে।

আমার দেশ : প্রচলিত পোশাকশিল্পের বাইরে আর কোন কোন খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব। এ জন্য করণীয় কী?

খোরশেদ আলম : নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে শুধু সৌরবিদ্যুতের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো প্রযুক্তিও বিবেচনায় নিতে হবে। চীনে এ ধরনের নতুন প্রযুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া পৌরসভার বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিও বাংলাদেশে কাজে লাগানো যেতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল হলেও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিকল্প উৎস তৈরি করা সম্ভব। চীন এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশে সরবরাহের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের উচিত দ্রুত তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া।

এ ছাড়া অটোমোবাইল, চামড়া, ওষুধশিল্প ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। যৌথ উদ্যোগে হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ওষুধশিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাজারব্যবস্থা এবং স্থানীয় কোম্পানিগুলোর স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

আমার দেশ : দেশের বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও অর্থনৈতিক সংস্কারের সময়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে ধরে রাখতে ও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিসিসিসিআইয়ের পরামর্শ কী?

খোরশেদ আলম : বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগের আগে কী ধরনের অবকাঠামো ও সেবা দেওয়া হবে, তা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কাঁচামাল এনে পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতে চাইলে সে প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা কোথাও কোথাও আতঙ্ক তৈরি করছে। এসব সমস্যা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিশেষ করে উত্তরা থেকে সাভার ইপিজেড ও আশুলিয়ায় যাতায়াতে বেহাল সড়ক এবং যানজট তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে। শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। ফ্লাইওভার নির্মাণের পাশাপাশি নিচের সড়ক ও সংযোগ ব্যবস্থাও পরিকল্পিতভাবে উন্নত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ট্রেড লাইসেন্সসহ সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন।

আমার দেশ : দেশের নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের যারা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আগ্রহী, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?

খোরশেদ আলম : চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হলে প্রথমে চীনা ভাষা সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিপণন, বিক্রয় কৌশল এবং পণ্যের বাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করলেই হবে না; হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। চীনে কোন কোন বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে এবং চীনের ক্রেতা ও বিপণনসংশ্লিষ্টদের বাংলাদেশে এনে সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন