আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ বাতিলের দাবি

স্টাফ রিপোর্টার

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ বাতিলের দাবি
ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

ভারত থেকে সুতা আমদানি কমাতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের সরকারি উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন।

এ সুবিধা বাতিল হলে তৈরি পোশাকশিল্প সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) নেতারা।

বিজ্ঞাপন

তারা বলেছেন, সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সোমাবার ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠন দুটি জানায়, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি আদেশ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর।

‘সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত পোশাক শিল্পের জন্য হুমকি: পাট শিল্পের পরে গার্মেন্টস খাত বন্ধের পাঁয়তারা’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান। এ সময় বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি রেজওয়ান সেলিম ও পরিচালক ফয়সাল সামাদ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে সেলিম রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট—এই ত্রিমুখী চাপের মধ্যেই সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত শিল্পকে আরো কোণঠাসা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও পোশাক খাতের মতামত উপেক্ষা করে একতরফাভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তিনি বলেন, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং ডিসেম্বর মাসে পতনের হার দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশে। এমন পরিস্থিতিতে সুতা মূল্য বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমাতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বস্ত্রখাতকে সহায়তা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক বসানোর পরিবর্তে সরাসরি নগদ সহায়তা, বিশেষ প্রণোদনা, করপোরেট কর ছাড়, স্বল্প সুদে ঋণ এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। অন্যথায় শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি।

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরো বলেন, এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সেফগার্ড চুক্তির ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী, এ ধরনের রক্ষণশীল ব্যবস্থা নেওয়ার আগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে গুরুতর ক্ষতির প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যা এখানে অনুসরণ করা হয়নি।

অন্যদিকে স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর সুরক্ষার যুক্তিতে নির্দিষ্ট কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো এক চিঠিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেয়। এ বিষয়ে জানানো হয়, আশির দশক থেকে রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে এই সুবিধা চালু থাকলেও অপব্যবহারের কারণে প্রতিবেশী দেশ থেকে কম দামে সুতা প্রবেশ বাড়ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বর দুই দফা আবেদন জানালে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন একটি বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করে, যা গত ৬ জানুয়ারি জমা দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এনবিআরকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, যার বড় অংশ নিট পোশাকনির্ভর। এই খাতে ব্যবহৃত প্রধান কাঁচামাল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভারত থেকে আসে। বিটিএমএর হিসাবে, দেশে এক কেজি সুতা উৎপাদনে ব্যয় প্রায় তিন ডলার হলেও প্রতিবেশী দেশে একই মানের পণ্য তৈরি হচ্ছে কম খরচে এবং তা বাংলাদেশে আরো কম দামে সরবরাহ করা হচ্ছে।

গত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় সুতা আমদানি দ্রুত বাড়ায় দেশীয় মিলগুলোর বিক্রি কমেছে বলে দাবি মন্ত্রণালয়ের। বর্তমানে কারখানাগুলো উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে এবং আর্থিক ক্ষতির কারণে ইতোমধ্যে ৫০টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নিট পোশাক খাত পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে, যা লিড টাইম বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন হ্রাস এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...