আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ

সরদার আনিছ

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে আগেভাগেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খেজুরসহ বিভিন্ন ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ যেসব পণ্যের অধিক চাহিদা, সেগুলোর মূল্য সাশ্রয়ী রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশা জানানো হয়, গত বছরের মতোই এবারের রমজানে নিত্যপণ্যের দামে মানুষ স্বস্তিতে থাকবে।

সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, আসন্ন রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রস্তুতি সন্তোষজনক। আমদানি পর্যায়ে ঋণপত্র খোলার পরিমাণ গতবারের চেয়েও বেশি । সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। নিত্যপণ্যের বাজারেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় রাখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেশকিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ওপর থেকে ভ্যাট তুলে নিয়েছে। রমজান উপলক্ষে খেজুর আমদানিতে আমদানি শুল্ক ৪০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। গত ২৪ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সুবিধা বহাল থাকবে।

এ ছাড়া বিগত বাজেটে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর–সংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করে খেজুরসহ সব ফল আমদানির ওপর প্রযোজ্য অগ্রিম আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। খেজুর ও অন্য ফল আমদানিতে গত বছর অগ্রিম আয়করে যে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা এ বছরও বহাল আছে।

এছাড়া সরিষার তেল, ময়দা, সুজি, মসুর ডাল, এলপিজি, বিস্কুট, লবণ ও গরম মসলাসহ এ জাতীয় পণ্যগুলোর উৎপাদন পর্যায়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক পর্যায়ে ভ্যাট রেয়াত দেওয়া হয়েছে।

সরকারি পদক্ষেপের প্রশংসা করে কেরানিগঞ্জ মডেল টাউনের বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, সরবরাহ প্রচুর থাকায় বেশিরভাগ মুদি পণ্যের দাম সন্তোষজনক। সব সময় বাড়ির কাছে কেরানিগঞ্জ বৌবাজার থেকে কেনাকাটা করি। গত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় থাকায় সবাই স্বস্তিতে রয়েছে।

শহরের বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, খামারের মুরগি প্রতি কেজি ১৫০-১৬০ টাকা, সোনালি ২৫০-২৮০ টাকা ও দেশি মুরগি ৫৫০-৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে যা গত বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১০-৩০ টাকা কম। খাসির গোশত প্রতি কেজি প্রায় ১২০০ টাকা ও গরুর গোশত ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা আগের বছরের চেয়ে ২০-৩০ টাকা কম। অন্যদিকে, চিনি প্রতি কেজি ১০০-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর যা ছিল ১৪০-১৫০ টাকা।

সাধারণ খেজুরের দাম কমে ১৮০-২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মাঝারি মানের ও প্রিমিয়াম মানের খেজুর যথাক্রমে ৪৫০-৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা কম। দেশি পেঁয়াজ এখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় প্রতি কেজি পাওয়া যাচ্ছে। আলু ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কয়েকদিনের ঘনকুয়াশায় শীতকালীন সবজির দাম বর্তমানে কিছু বাড়তি থাকলেও রমজানের আগে কমে আসবে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা।

কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা এরফান আলী বলেন, ২-৩ দিন থেকে মুরগির দাম কিছুটা বাড়লেও এখনো আগের বছরের তুলনায় কম। তিনি আরো বলেন, ‘বড় সিন্ডিকেট মুরগির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। যারা বাচ্চা উৎপাদন করে ও মুরগির খাবার দেয়, তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার যদি সিন্ডিকেটগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে মুরগির দাম আরো কমার সুযোগ রয়েছে।’

কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের মুদি ব্যবসায়ী ইমাম উদ্দিন বাবলু আমার দেশকে বলেন, রমজানে অধিক চাহিদাসম্পন্ন পণ্যগুলোর দাম কমতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ছোলা, ডাল, খেসারি, কাবলিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের দাম কমেছে। আমদানি বাড়ার পাশাপাশি সরকারের সক্রিয় তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে রমজানের আগে পণ্যের দাম আরো কমতে পারে।

এদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের খুচরা বাজার দর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের বাজারদরের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণঅভ্যুত্থানের পর পেঁয়াজ ও রসুনসহ ২০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের দাম কমেছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কৃষি পণ্যের উৎপাদন হলেও, এর আগে বাজারে দামের চিত্র ছিল সব সময় ঊর্ধ্বমুখী।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের আগে আলুর কেজি প্রতি খুচরা দাম ছিল ৬০ টাকা। এ বছরে সবজিটির দাম ৫৮ শতাংশ কমে হয়েছে ২৫ টাকা। গণঅভ্যুত্থানের আগে দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল ১২০ টাকা। এ বছর দাম কমে হয়েছে ৪৫-৫০ টাকা। আমদানী করা পেঁয়াজের দাম ছিল ১০০ টাকা। বর্তমানে তা দাম কমে হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। দেশি রসুনের দাম ছিল ২২০ টাকা। এ বছর দাম ৪৫ শতাংশ কমে হয়েছে ১২০ টাকা। চীনা রসুনের দাম ছিল ২২০ টাকা। এ বছর ২২ শতাংশ দাম কমে তা হয়েছে ১৭০ টাকা।

গণঅভ্যুত্থানের আগে মোটা জাতের মসুরি ডালের দাম ছিল ১১০ টাকা। এ বছর কমে হয়েছে ৯০ টাকা। মোটা জাতের মুগডালের মূল্য ছিল ১৫০ টাকা। এ বছর ২৩ শতাংশ দাম কমে তা হয়েছে ১১৫ টাকা। এছাড়া দেশি মুরগির কেজি প্রতি মূল্য ছিল ৬০০ টাকা। এ বছর তা কমে হয়েছে ৫৮০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির মূল্য ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। এ বছর তা কমে হয়েছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। ডিমের পিস প্রতি মূল্য ছিল ১২.১০ টাকা। এ বছর তা কমে হয়েছে ৯.১৬ টাকা।

সরেজমিন বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানের আগে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি পণ্যের দাম অনেক সময় সাধারণ নাগরিকদের নাগালের বাইরে ছিল। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এম এম আকাশ বলেন, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ে বিগত সময়ে কথা হলেও, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কোনো উদ্যোগ দেখিনি। গণঅভ্যুত্থানের পর স্বল্প পরিসরে হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সরকার কমাতে পেরেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন