আগস্টে একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হবে প্রশাসক

আগস্টে একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হবে প্রশাসক

দুর্বল একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী আগস্টের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে সব ব্যাংক থেকে প্রশাসকদের তুলে নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহেই এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করা হতে পারে।

গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে, গত রোববার পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন গভর্নর। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, প্রশাসকদের আরো কিছুদিন বহাল রাখা উচিত।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, বৈঠকে পাঁচ ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রশাসক প্রত্যাহারের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে তা একযোগে নয়, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। আগস্টের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনই প্রশাসক প্রত্যাহারের পক্ষে নন। কারণ একীভূত পাঁচ ব্যাংকে এখনো কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকদের সব তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনা হবে। এটি একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ কাজ। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকরা এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাদের মাধ্যমেই কাজটি শেষ হলে তা আরো কার্যকর হবে বলে তারা মনে করছেন।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম সাধারণ ব্যাংকের তুলনায় ভিন্ন ধরনের। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান অবস্থা, চলমান সংস্কার এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশাসকদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রশাসক প্রত্যাহারের আগে চলমান সংস্কার কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত। আলোচ্য পাঁচ ব্যাংক হলো—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক।

জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি চারটি ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের কর্ণধার ও বহুল আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় জামানত ছাড়াই ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক লুটপাটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নামে হাতিয়ে নেওয়া হয়। এতে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থও ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার শরিয়াহভিত্তিক এ পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করে।

ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পুরো অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্কিম ঘোষণা করেছে।

জানা গেছে, এ তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত আট লাখ ২২ হাজার আমানতকারীকে তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। শুধু ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তিন লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের ঋণ স্থিতি ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিতরণ করা এসব ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বর্তমানে এ পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ‍ঋণের ৮৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

আমানতকারীদের আন্দোলন

পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন। এরপর মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে যান তারা। পরে তাদের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় হেয়ারকাট বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। এছাড়া আমানত মুনাফা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা বাতিল করে অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মতো স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর দাবিও জানানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন